Sunday, 31 December 2017

রাইমার সন্ততিরা

গত ডিসেম্বরের ঘটনা ৷ সরকারী কাজে গিয়েছি আমবাসা ৷ ধলাই ডি এম অফিসের কনফারেন্স হলে একটি মিটিং ছিল ৷ দুপুরের খাবার ব্যবস্থাও ছিল ৷ খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন হয়েছে জহরনগর পুলিশ লাইনে ৷ সেখানেই বরুণের সাথে দেখা ৷ বরুণ এখন কনস্টেবল ৷ পুলিশের পোশাকে তাকে প্রথম দেখা ৷ আগে এস পি ও হিসাবে কাজ করলেও পুলিশের পোশাকে তাকে দেখিনি ৷ সে তখন নৌকা চালাত ৷ বরুণের সাথে আমার পরিচয় আজ থেকে প্রায় দেড় দশক আগে ৷ আমি তখন টি এস আর বাহিনীর কমান্ডেন্ট ৷ আমাদের সদর অমরপুরের ডলুমায় ৷ ত্রিপুরায় উগ্রপন্থা চরম আকার নিয়েছে ৷ ডুম্বুর জলাশয় থেকে জেলেদের, বিশেষত অনুপজাতিদের বৈরীরা অপহরণ করত ৷ রইস্যাবড়ি, গন্ডাছড়া এবং তুই-চাকমাতে আমাদের ক্যাম্প ছিল ৷ এই ক্যাম্পগুলিকে ভিত্তি করে আমরা কখনো একটি বা দুইটি মোটরবোটে টহলদারি করতাম ৷ ডুম্বুর বিশাল আকারের জলাধার ৷ বর্ষায় ব্যাপ্তি ষাট বর্গ-কিলোমিটার ছাড়িয়ে যায় ৷ উত্তর এবং পূর্ব দিকে কালাঝাড়ি পাহাড়৷ পশ্চিমে বড়মুড়া-দেবতামুড়া ৷ দক্ষিণে বাংলাদেশ এবং মিয়ামি রিজার্ভ ফরেস্ট ৷ এই পাহাড় ও বনে ঘাটি করে উগ্রপন্থীরা সক্রিয় ছিল ৷ একটি কিংবা দুইটি নৌকা নিয়ে এই বিশাল জলাধার এলাকায় টহলদারি করা দুঃসাধ্য কাজ ৷ অবস্থা অনেকটা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরব পক্ষের বিশাল সেনাবাহিনীর সামনে অর্জুনের অসহায়তার সাথে তুলনীয় ৷ বরুণ আমাদের কাছে শ্রীকৃষ্ণের মত সারথি সেজে অবতীর্ণ হয়েছিল ৷ লাঞ্চের পর তার সাথে একান্তে কিছুক্ষণ গল্প করি ৷ পুরানো স্মৃতি রোমন্থন করি ৷ বলি, ‘এখনতো তোমাদের এলাকায় শান্তি ?’
     একটু চুপ থেকে, সে বলে, ‘স্যার, শান্তি কোথায়?’
     একটি গল্প শোনায় ৷ রইস্যাবাড়ি থানাধীন রতননগর এলাকা ৷ পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে রাইমা নদী ৷ বর্ষার মরশুম ৷ জুলাই মাস ৷ স্বপন ও প্রদীপ সমবয়সী ৷ দুজনেরই বয়স এগারো ৷ স্বপনের ছোট ভাই রতন ৷ বয়স সাত ৷ প্রদীপের ভাই দিলীপ৷ বয়স আট৷ সবাই জনজাতি পরিবারের ৷ অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া অংশের ৷ তাদের ছ`মাস কাটে পাহাড়ের জুম হাটে ৷ ছ`মাস অপেক্ষাকৃত সমতলে ৷ কারণ রেগার কাজ পাওয়া যায় ৷ এই সুবাদেই বাচ্চাগুলি ভর্তি হয়েছিল স্থানীয় স্কুলে ৷ মিড-ডে মিলের সাথে সেদিন একটি করে ডিম ছিল৷ স্কুলের আঙ্গিনায় একটি আমগাছ ৷ স্বপন ও প্রদীপ বাজি রাখে ৷ দু`জনের মধ্যে দৌড়ে আম গাছটি যে আগে ছুঁতে পারবে, সে অতিরিক্ত হিসাবে বন্ধুর ডিমটি পাবে ৷ বাজিতে প্রদীপ জয়ী হয় ৷ স্বপন কথা রাখে না৷ বন্ধুকে নিজের ডিমটি দেয় না ৷ প্রদীপ তার রাগ মনে মনে পুষে রাখে ৷ মধ্যে  দিন কয়েক স্কুল বন্ধ ছিল ৷ স্কুল খুললে বন্ধুর সাথে স্বাভাবিক ভাবে মেশে ৷
     মাস খানেক পরের ঘটনা ৷ প্রদীপ স্বপনকে প্রস্তাব দেয়, ময়না পাখি পুষতে চায় কি না ৷ সে রাইমা নদীর পারের জঙ্গলে ময়নার বাসা দেখে এসেছে ৷ দুটো বাচ্চা ডানা মেলার অপেক্ষায় ৷ প্রদীপের কথায়, স্বপন একপায়ে রাজি ৷ তাদের দু`জনের সঙ্গ নেয় রতন ও দিলীপ ৷ প্রদীপ একটি টাক্কল দাও নেয় ৷ ঝোপ-ঝাড় কাটতে হবে ৷ তখন সকাল ৷ রাইমা নদীর পার ধরে প্রদীপের দেখানো পথে চারজন অনেকটা পথ এগিয়ে চলে ৷ আশপাশে ঘরবাড়ি নেই ৷ ছোট ছোট ঝোপ-ঝাড় ৷ এবার একটি জায়গায় প্রদীপ থামে ৷ একটি ডুম্বুর গাছের কাছে গিয়ে নিচু হয়ে থাকে ৷ কিছু দেখার চেষ্টা করে ৷ স্বপনকে ইশারায় ডাকে ৷ আঙ্গুল দিয়ে একটি ঝোপের দিকে দেখায় ৷ ময়নার বাসা দেখতে বলে ৷ স্বপন ঝুঁকে পড়ে বন্ধুর দেখানো দিশাতে তাকায় ৷ মুহূর্তে প্রদীপ টাক্কল দিয়ে স্বপনের মাথায় কোপাতে শুরু করে ৷ তার মুখ থেকে পশুর মত কিছু অবোধ্য আওয়াজ বেরিয়ে আসে ৷ স্বপনের সেখানেই মৃত্যু হয় ৷ ঘটনার আকস্মিকতায় রতন ও দিলীপ তখন বাকরুদ্ধ ৷ এবার প্রদীপ তার জিঘাংসার কারণ ব্যক্ত করে ৷ রতন এবং দিলীপকে শাসায় ৷ মুখ খুললে তাদেরও পরিণতি হবে স্বপনের মত ৷
     তারা গ্রামের দিকে রওয়ানা হয় ৷ কিছুদূর আসার পর রতনের কান্না পায়৷ সে বলে, ভাইয়ের মৃত্যুর কথা বাড়িতে বলে দেবে ৷ প্রদীপের হিংস্রতা আবার প্রকাশ পায় ৷ রতনকেও খুন করে ৷ রাইমা নদীর জলে টাক্কলটি পরিষ্কার করে ৷ ইতিমধ্যে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামে৷ দুপুরের কিছু পর প্রদীপ ও দিলীপ ঘরে ফিরে৷ বিকেল থেকে নিরুদ্দেশ স্বপন ও রতনের খবর শুরু হয় ৷ প্রদীপ ও দিলীপকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়৷ অনেকে সকালে চারটি বাচ্চাকে একসাথে যেতে দেখেছে ৷ প্রদীপ বলে, তারা রাইমা নদীর অপর পারে গিয়েছিল ৷ ফেরার পথে বৃষ্টি নামে ৷ তাড়াহুড়ো করে ফিরে আসে ৷ লক্ষ্য করেনি বন্ধুরা ফিরল কি না ৷ দিলীপও দাদাকে সমর্থন করে ৷ পাহাড়ি নদী ৷ খুব দ্রুত জলস্ফীতি হয় ৷ স্বপন ও রতন সাতার জানত ৷ তল্লাশি চলল ৷ বাচ্চা দু`টির হদিস মিলল না ৷ সবাই ভাবল বানের তোড়ে বাচ্চা দু`টি ভেসে গেছে ৷ কিন্তু মৃতদেহ মেলে না ৷ পুলিশও কিছুটা তৎপর হল ৷
     পরদিন থেকে বাচ্চাদের স্কুলে পরীক্ষা ৷ প্রদীপ ও দিলীপ পরীক্ষা দেয় ৷ এর মধ্যেই মাঝে মাঝে ডেকে এনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ৷ এবার আলাদা আলাদা ৷ তৃতীয় দিন সন্ধ্যার পর দিলীপ প্রথম মুখ খোলে ৷ তারপর প্রদীপও স্বীকার করে ৷ মৃতদেহ দু`টি উদ্ধার হয় ৷ সাথে খুনের হাতিয়ার ৷
     গল্প শুনে আমি থ-বনে যাই ৷ বরুণের কথায় আমার সম্বিৎ ফিরে, ‘স্যার, প্রদীপের এই আক্রোশের কারণ কি?’
     একটু সামলে নিয়ে বলি, ‘এই জিঘাংসা হয়তো সিনেমা-টিভি থেকেই প্রদীপ শিখেছে ৷ টিভি-মোবাইলের দৌড়ত্ম্য এখন সর্বত্র ৷ তবে আইন বহুরূপী ৷ বড়দের আইন এবং ছোটদের আইন আলাদা ৷’
     সে আমার উত্তরে খুশি হয় না ৷ ইতস্তত: করে ৷ প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলি, ‘এই বছরের দাঙ্গার খবর কি?’
     ‘ভালো-ই ৷’
     মাছের দাঙ্গা ৷ শুধু ডুম্বুর জলাশয়েই হয় ৷ জেলেরা সারা বছর দাঙ্গার অপেক্ষায় থাকে ৷ প্রতি বছর মে মাসের মাঝামাঝি ৷ মরশুমের তৃতীয় কিংবা চতুর্থ বৃষ্টির সময় ডুম্বুরের মাছেরা উন্মত্ত হয়ে উঠে ৷ নিজেদের মধ্যে ঢুসা-ঢুসি দাঙ্গা-হাঙ্গামায় লিপ্ত হয় ৷ অনেক মাছ ডাঙ্গায় লাফিয়ে উঠে ৷ ছোট-বড় সব প্রজাতির মাছের মধ্যেই এই পাগলপন দেখা যায় ৷ তবে ঘনিয়া মাছেরা সর্বাগ্রে এগিয়ে থাকে ৷ মানুষের হাতে ধরা পড়ে ৷ এই পরিস্থিতি তিন-চার দিন চলে ৷ তখন জালেও সবচাইতে বেশী মাছ আটক হয় ৷ বরুণই আমায় এইসব বলেছিল ৷ গাড়িতে ফেরার পথে আমার মন পড়ে থাকে ডুম্বুর ও তার অববাহিকায় ৷ স্মৃতিতে বরুণ পথ-পদর্শক ৷ বরুণের জন্ম জেলে পরিবারে ৷ ডুম্বুর তার কাছে হাতের তালুর মত ৷ দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশি ৷ পাখিদের কলতান ৷ জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য ৷ মাঝে মাঝে ছোট ছোট দ্বীপ ৷ এদিক সেদিক জল থেকে ভেসে ওঠা বিশাল বিশাল মরা গাছের মাথা ৷ অনেকগুলি ফসিলে পরিণত হয়েছে ৷ তবে মাছরাঙা ও বকেরা এইগুলি পেয়ে মহাখুশি ৷ শিকারের উপর নিশানা তাক করার জন্য তাদের কাছে এর চেয়ে ভালো কোনও বিকল্প নেই ৷
     অনেক গাছের গোড়া জলের নিচে তলিয়ে আছে ৷ নৌ-চলাচলে ব্যাঘাত করে৷ কোন প্রকার কম্পাস কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই, সব বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে বরুণ আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিত ৷ এমনকি রাত্রিতে টর্চের আলো ফেলে অবলীলায় এগিয়ে যেত ৷ নৌকায় দেড় ঘণ্টা, দুই ঘণ্টার এইসব সফরে বাইরের প্রকৃতিকে দেখে ঠাহর করতে পারতাম না কোনদিকে চলেছি ৷ চারিদিকে শুধু জল আর জল ৷ কখনো দূরে কালাঝাড়ি পাহাড় নজরে আসত ৷ তখন বুঝতে পারতাম কোন দিকে যাচ্ছি ৷ গন্ডাছড়া, রইস্যাবাড়ি এবং মন্দির-ঘাট যেন একটি সমবাহু ত্রিভুজের তিন কোণায় দাঁড়িয়ে ৷ আর এর ভারকেন্দ্রে নারকেল বাগান ৷ পথে এক সময় নারকেল বাগান আসত ৷
     বরুণই আমাকে ডুম্বুর জলাশয়ের আশপাশের গ্রামগুলি চেনায় ৷ চালচিত্র বলে৷ গুনচরণপাড়া, রামনগর, মোহন্তপাড়া, দেবেন্দ্রদাসপাড়া, জীবকান্তপাড়া, সাতবাইয়াপাড়া, ইন্দ্রজয়পাড়া, গনবানপাড়া, বিশ্বকর্মাপাড়া, গোমতী, নারায়ণপাড়া, কিনামোহনপাড়া ইত্যাদি দ্বীপ-উপদ্বীপ ৷ দ্বীপের বাসিন্দাদের সিংহভাগ চাকমা সম্প্রদায়ের ৷ মৎস্যজীবী ৷ হাতে-গোনা কিছু রিয়াং, ত্রিপুরী, জমাতিয়া ও আসলং পরিবার ৷ চাকমাদের একটি বড় অংশ মগ এবং কারবারি ৷ অধিকাংশ ব্যবসার সাথে জড়িয়ে আছে ৷ বাংলাদেশেও যায় ৷ তবে মগেরা অর্থনৈতিক দিক থেকে কারবারিদের চেয়ে দুর্বল ৷
     উপদ্বীপের বাসিন্দাদের বড় অংশ মৎস্যজীবী দাস সম্প্রদায়ের ৷ এই পরিবারগুলি এবং নতুন-বাজার-যতনবাড়ি এলাকার মৎস্যজীবী আড়াই দশকের উগ্রপন্থায় সবচাইতে ক্ষতিগ্রস্ত ৷ মাছ-ধরার পাশাপাশি কৃষি ও ছোটখাটো ব্যবসা করে ৷ একটি অংশ চাকুরীজীবী ৷ জেলেদের মাছ ধরার পদ্ধতি যথেষ্ট আকর্ষণীয়৷ অপেক্ষাকৃত গভীর জলে গ্রেনেড-জাল পেতে মাছ ধরা হয় ৷ গ্রেনেড জাল ব্যাডমিন্টনের নেটের মত ৷ ছিদ্রের উপর নির্ভর করে কি আকৃতির মাছ ধরা পড়বে ৷ তবে জাল পাহারা দিতে হয় ৷ অনেক সময়ই মাছ-সুদ্ধ জাল চুরি হয়ে যায়৷ বড় মাছ আটকা পড়লে, আষ্ঠে-পৃষ্ঠে জাল জড়িয়ে দিতে হয় ৷ অপেক্ষাকৃত কম জলে বেড়জাল দিয়ে মাছ ধরে ৷ আর একদমই কম জলে ফেলুইন জাল এবং বাঁশের চাই দিয়ে মাছ ধরে ৷ এর বাইরে রয়েছে লড়-বঁড়শি, ছিপ এবং গর্ত সেচন করে মাছ ধরা ৷
     রিয়াং, আসলং ও ত্রিপুরীরা জলের থেকে দূরেই থাকে ৷ জুমচাষ করে ৷ জঙ্গলের বাঁশ ও লাকড়ি বিক্রি করে ৷ এদের একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে উগ্রপন্থায় জড়িয়ে গিয়েছিল ৷ এখন আত্ম-সমর্পণকারী বৈরী ৷ অনেকে চাকুরী করে ৷ রাবার-বাগান ও ফলের-বাগান গড়ে তুলেছে ৷ কৃষিকাজ করে ৷ পশুপালন করে ৷ শিক্ষায়ও এগিয়ে গেছে ৷ কিন্তু কিছুতেই তপন ও রতনের খুনের কথা ভুলতে পারি না ৷ রাইমা নদীর সৃষ্টির একটি উপকথা মনে আসে ৷ স্বর্গের এক দেবতা রাইমা নামে এক সুন্দরী পার্বতী মেয়ের প্রেমে পড়েন ৷ তিনি একটি পাইথন সাপের রূপে দেখা দেন ৷ রাইমাও তাঁকে ভালোবাসে ৷ দু`জনের গোপনে বিয়ে হয় ৷ এই কথা রাইমার বাবা ভগীরথ ওঝা জানতে পারেন ৷ মেয়ে-জামাইয়ের উপর মহা খাপ্পা হন ৷ তিনি পাইথন সাপটিকে মেরে কুটি কুটি করে মাটিতে পুঁতে ফেলেন ৷ রাইমা তাঁর স্বামীর কবরস্থানে রোজ গিয়ে কেঁদে ভাসিয়ে দিত ৷ বছর ঘুরতে সেই স্থানে সুন্দর গন্ধযুক্ত ফুলগাছ জন্মায় ৷ ফুলটির নাম খুমপুই লুঙ বা দোলনচাঁপা৷ ক্রমে সেই গাছটির নিচ থেকে একটি অশ্রুর স্রোত বেরুতে দেখা যায় ৷ সেই স্রোত থেকে স্রোতস্বিনী রাইমার জন্ম ৷ রাইমা নদী গোমতীকে পুষ্ট করেছে ৷
     প্রদীপ এবং উগ্রবাদীরা হয়তো ভগীরথ ওঝার বংশধর ৷ রাইমার সন্ততিরা আক্রান্ত হয়৷ প্রকৃতির এই অপূর্ব শ্যামলিমার মধ্যেও রক্ত ঝরে ৷


[গল্পটি এ`বছরের রাজ্যভিত্তিক অদ্বৈত মল্লবর্মন ছোট গল্প প্রতিযোগিতায় তৃতীয় পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয়েছে ৷]

Monday, 25 September 2017

বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য



এখন শরৎ কাল ৷ প্রকৃতি তার নিজ সাজে সেজেছে ৷ শারদোৎসব সবার জন্য ৷ একত্রে আনন্দ-উৎসব করার ক্ষণ ৷ দেবী দুর্গা মাতৃশক্তির প্রতীক ৷ তিনি লোকায়ত মূর্তি-রূপে আমাদের কাছে পূজ্য ৷ তাঁর এই রূপ অতীন্ত্রিয় সৌন্দর্য্যের ৷ পাশাপাশি তাঁর রয়েছ একটি সংহারমূর্তি ৷ তিনি সপরিবারে আসেন ৷ শত্রু অসুরকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন ৷ সাথে বিচিত্র সমাবেশ ৷ সাপ-ময়ূর ৷ ইঁদুর-পেঁচা ৷ মোষ-সিংহ ৷ খাদ্য-খাদকের সহাবস্থান ৷ বৈপরীত্যের মধ্যে ঐক্য ৷ অসুরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি দেবতাদের রক্ষাকর্তা ৷ সব শুভ শক্তির ঐক্যবদ্ধ বহিঃপ্রকাশ ৷ এই সম্মিলন ছাড়া অশুভ অসুর দমন সম্ভব নয় ৷ এই সত্যই মূর্ত হয়, মাতৃ-রূপিণী দেবী মূর্তিতে ৷আমরা আজ দুরূহ সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছি ৷ জীবনানন্দের ভাষায়:

‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুনার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া ৷
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয় ৷’

ব্যক্তি মানুষের মধ্যে এবং সমাজের মধ্যে অসুররূপী পশুত্ব আজও বিরাজমান ৷ এর বিরুদ্ধেই আমরা লড়ছি ৷ শুভ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, মা আমাদের অনুপ্রেরণা যোগান ৷ এই সংগ্রামে আপনারাও পাশে থাকবেন এই কামনা করছি

অরিন্দম নাথ

Tuesday, 22 August 2017

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর....


গত ২৫ শে শ্রাবণ, ১৪২৪ বাং (১১ই আগস্ট, ২০১৭ ইং) তারিখে আমাদের পরম পূজনীয় শ্রীযুক্ত দেবেন্দ্রমোহন নাথ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তাঁর জন্ম অবিভক্ত ভারতবর্ষের পূর্ব-বঙ্গের সিলেট জিলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম হোঁরগাঁওতে ২৬ শে চৈত্র, ১৪২৪ বাং (৯ই আগস্ট, ১৯২৭ ইং) তারিখে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে পিতা হরিমোহন নাথ মাতা শান্তিময়ী নাথ৷ পরিবারের জ্যেষ্ঠ ছেলে দেবেন্দ্রমোহন নাথ, ওরফে দেবু এরপর তিন বোন জন্মদিনটি ছিল খুবই স্মরণীয় কারণ, সেদিন ভূমিকম্পে মেদিনী কেঁপে উঠেছিল অমারাত্রির শেষে সূর্য ওঠে ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনায় দেবু ভীষণ তুখোড় প্রতি-বছর জলপানি বা বৃত্তি পেতেন হোঁরগাঁওতে প্রাথমিক শিক্ষা এরপর ভর্তি হন হবিগঞ্জ হাই স্কুলে৷ থাকতেন স্কুলের বোর্ডিং- মেট্রিক পরীক্ষা দেন হবিগঞ্জের প্রখ্যাত উকিল হরমোহন নাথের বাড়িতে থেকে স্কুলের শিক্ষকদের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্রটি অংক এবং সংস্কৃতে লেটারসহ, স্টার মার্কস নিয়ে মেট্রিক পাশ করেন

এরপর পাড়ি জমান কলকাতায় প্রথমে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সী কলেজে কলা বিভাগে বিজ্ঞান পড়ার জন্য প্রেসিডেন্সী কলেজে ছেড়ে দেন এবার ভর্তি হন বিদ্যাসাগর কলেজে৷ বন্ধু-প্রীতির জন্য এক বছর পরীক্ষায় ড্রপ দেন সেখান থেকেই বিজ্ঞানে স্নাতক হবিগঞ্জ হাই স্কুলের সাথেই ছিল প্রখ্যাত গণ-সংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের বাড়ি জমিদার বাড়ির ছেলে বয়সে দেবুর চেয়ে বড় ছোটভাই, স্কুলে দেবুর সহপাঠী৷ হেমাঙ্গ বিশ্বাস তখনই সাথীদের নিয়ে স্বদেশী আন্দোলন যুক্ত হয়েছিলেন গান বাঁধতেন৷ এর রেশ দেবুর পরবর্তী জীবনেও রয়ে যায় কলকাতায় এসে আই পি টি - প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখেন৷ সাথে ছিলেন ছিলেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সমর্থক

প্রথম চাকুরী পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকে কলকাতায় সরকারী পরিসংখ্যান দপ্তরে তারপর কলকাতার টি-বোর্ডে উচ্চপদে চাকুরীতে যোগ দেন সেখানে তাঁর সহকর্মী ছিলেন প্রখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী প্রসাদ সেন বিয়ে করেন ১৯৫৮ সালের ৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে স্ত্রী শ্রীমতী নীলিমা নাথ ওরফে টুকু শিলচরের প্রখ্যাত সমাজ-সংস্কারক সোমনাথ পণ্ডিতের নাতনি এবং প্রধান-শিক্ষক পাণ্ডবচন্দ্র নাথের কন্যা বয়সে তাঁর চেয়ে বার-তেরো বছরের ছোট অত্যন্ত সুন্দরী এবং মৃদুভাষী টুকু, হয়ে উঠেছিলেন তাঁর যোগ্য সহধর্মিণী সুখ-দুঃখের সাথী

বিয়ের পর ভাড়া থাকতেন প্রখ্যাত উকিল আদিনাথ গাঙ্গুলিদের বাড়িতে সেখানেই ১৯৫৯-এর জুনে তাঁর বড় ছেলের জন্ম ততদিনে দেশ-বিভাগ হয়েছে স্বাধীনতার আগেই তাঁর বাবা-কাকারা জমি হস্তান্তর করে চলে এসেছিলেন ত্রিপুরার ধর্মনগরে কিন্তু জীবন-সংগ্রামে বার বার পিছিয়ে পড়ছিলেন ষাটের দশকের প্রথম দিকে টি-বোর্ডের ভালো চাকুরী ছেড়ে তিনিও চলে আসেন ত্রিপুরায় পরিবারের হাল ধরতে ১৯৬০ সালের শেষ দিকে শিক্ষকতার চাকুরী নিয়ে যোগ দেন ধর্মনগর বালিকা বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন সেই স্কুলে চাকুরী করেন তাঁর অসংখ্য গুণমুগ্ধ ছাত্রীদের কাছে তিনি দেবেন স্যার হিসাবে আজীবন পরিচিত ছিলেন অবসরের আগে, শেষের তিন-চার বছর পদোন্নতি নিয়ে সহকারী প্রধান-শিক্ষক হিসাবে চাকুরী করেন ধর্মনগরের গঙ্গানগর এবং পদ্মপুর উচ্চ-মাধ্যমিক স্কুলে

ধুতি-পাঞ্জাবী, চটি এবং ছাতি এই ছিল তাঁর পোশাক উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে,ওই যে তিনি, যে বাহির পথে’, গানটি কবিগুরু যেন তাঁকে দেখেই রচনা করেছিলেন মাছ-ভাত খেতে ভালোবাসতেন একসময় পান খেতেন ফ্যারেনজাইটিসে ভুগে ছেড়ে দেন প্রতিদিন সকালে যোগ-ব্যায়াম প্রাতঃভ্রমণ করতেন বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়েও ইংরেজি, বাংলা সংস্কৃত সাহিত্যের উপর তাঁর ছিল অগাধ দখল রবীন্দ্র সংগীত শুনতে ভালোবাসতেন জর্জ বিশ্বাস ছিলেন তাঁর প্রিয় শিল্পী বিশেষত:, শিল্পীর কণ্ঠেক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’, গানটি ছিল তাঁর খুবই প্রিয়

তাঁর অনুকরণীয় জীবন-শৈলী আত্মীয়-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব এবং ছাত্র-ছাত্রী সবার মনেই প্রভাব ফেলত প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষে তাদেরকে সৎ-নাগরিক হয়ে ওঠার পথে প্রেরণা যুগিয়েছে সফল শিক্ষকের পাশাপাশি, শ্রীযুক্ত দেবেন্দ্রমোহন নাথ একজন সফল পিতাও বটে তাঁর নীতি আদর্শ এবং সংস্কৃতি-মনা মনের পরশ ছেলে-মেয়ে এবং নাতি-নাতনিদের মধ্যে পৌঁছে দেবার চেষ্টা করেছেন তিন ছেলে এবং তিন মেয়ের সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত প্রত্যেকেই আজ নিজ-নিজ পরিচিতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে

যৌবনে আই পি টি - পরশ, তাঁকে কর্মজীবনে কর্মচারী আন্দোলনে এক অগ্রণী ভূমিকা নিতে প্রেরণা যুগিয়েছে চাকুরী থেকে অবসরের পর তিনি দশ-বারো বছর বাম-পন্থী আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রেখেছিলেন সফল সংঘটক হিসাবে অবিভক্ত উত্তর জেলায় দেবেন্দ্রমোহন নাথ এখনও একটি পরিচিত নাম গত ষোল-সতের বছর যাবত তিনি নিজেকে প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে মুক্ত রেখেছিলেন

গত ১৬ই এপ্রিল, ২০১৫ ইং তিনি বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পান কলকাতার DESUN হাসপাতালে গত ২৫শে এপ্রিল, ২০১৫ ইং তাঁর অপারেশন হয় করেন ডাঃ রুদ্রজিত কাঞ্জিলাল কাকতালীয় ভাবে তাঁকে যখন অপারেশন টেবিলে তোলা হয়, সেই মুহূর্তে মেদিনী আবার কেঁপে ওঠে সেটা ছিল নেপালে বিধ্বংসী ভূমিকম্পের প্রথম দিন৷ ৬ই মে, ২০১৫ ইং তারিখে তাঁকে আগরতলার আই জি এম হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় তাঁর বড়ছেলে ডাঃ দেবাশিস নাথের চিকিৎসায় তিনি অনেকটা সুস্থ হয়ে ওঠেন তবে মাঝে-মধ্যেই আই সি ইউ-তে ভর্তি হতেন এবারে, আই জি এমের আই সি ইউ-তে ভর্তি হন ১৩ই জুলাই, ২০১৭ ইং তারিখে অত্যন্ত প্রচার-বিমুখ, রবীন্দ্রানুরাগী এই শিক্ষাবিদের মৃত্যু হয় ১১ই আগস্ট, ২০১৭ ইং তারিখে তিনি ছিলেন নিজের সময়ের চেয়ে এগিয়ে তাই তিনি মরণোত্তর দেহ দান করে গিয়েছেন তাঁর ইচ্ছানুযায়ী, ১২ই আগস্ট, ২০১৭ ইং তারিখে তাঁর দেহ, জি এম সি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে  

তাঁর জীবনের শেষ দিনটিও প্রকৃতি প্রথম দিনের মত স্মরণীয় করে রেখেছে কাকতালীয় ভাবে, সেদিন আগরতলায় অকল্পনীয় বৃষ্টি বন্যা পরিলক্ষিত হয় এই অতল জলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি চলে গেলেন কাউকে সুযোগই দিলেন না তাঁর জন্য উতলা হতে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে তাঁর ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি, ছাত্র-ছাত্রী এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীরা, তাঁর আদর্শকে অনুসরণ করে আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর ৷৷