Sunday, 8 January 2017

আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল....



১৯৯২ সাল ৷ এপ্রিল কিংবা মে মাস ৷ আমি তখন প্রশিক্ষণার্থী ডি এস পি ৷ মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে আছি ৷ বি এস এফের একটি ট্রেনিং সেন্টার আছে ৷ সি এস ডাব্লু টি ৷ সেখানে তিন মাসের ট্রেনিং করছি ৷ সত্যিকার অর্থেই তিন মাস ৷ মার্চের মাঝামাঝি থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত ৷ তখন ইন্দোরে প্রচণ্ড গরম ৷ আমার বন্ধু কেরি মারাক-তো জন্ডিসেই আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল ৷

স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরে:-
এরই মধ্য উজ্জয়িনীতে শুরু হলো কুম্ভমেলা ৷ ইন্দোর এবং উজ্জয়িনী খুব কাছাকাছি ৷ তাই সুযোগ হাতছাড়া করলাম না ৷ এক রবিবারে কুম্ভমেলায় গেলাম ৷ সাথে দু`একজন বন্ধু ৷ সহকর্মী ৷ আরো একটি কারণ ছিলো ৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্বপ্ন’ কবিতা ৷ ‘দূরে বহুদূরে, স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরে, খুঁজিতে গেছিনু কবে শিপ্রানদীপারে...৷’ উজ্জয়িনী ভারতের মধ্য প্রদেশ রাজ্যের একটি জেলা শহর ৷ ভারতের একটি প্রাচীন নগরী ৷ খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে নির্মিত এই শহর ৷ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী ৷ শক ও গুপ্তযুগে এই নগরী জ্যোতিষ চর্চার কেন্দ্র ছিল ৷ উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দিরেও গেলাম ৷ মনে মনে কবির চিত্রিত ছবিরও চিন্তা করলাম ৷ কবির সাথে তাঁর মালবিকার দেখা হয়েছিলো সন্ধ্যে বেলায় ৷ হয়তো খানিকটা নির্জনতায় ৷ আর আমরা যখন মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম তখন ভর দুপুর বেলা ৷ লাখো পূণ্যার্থীর ভিড় ৷ সবাই শিপ্রা নদীতে অবগাহনে ব্যস্ত ৷ সাথে মাইকে উৎকর্ণ আওয়াজ ৷ বাতাসে লূ-র আবহ ৷ সন্ধ্যার স্নিগ্ধতা নামার আগেই সেদিন ইন্দোরে ফিরে এসেছিলাম ৷

সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে :-
তারপর অনেক বছর চলে গেছে ৷ আর পাঁচজন মোটামুটি শিক্ষিত বাঙ্গালী ছেলের মতোই আমাকে আরেকটি কবিতা নাড়া দেয় ৷ জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ ৷ রবীন্দ্রনাথের ‘স্বপ্ন’ এবং জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ কবিতার মধ্যে ভীষণ রকম সাদৃশ্য ৷ দুটোই মৌলিক রচনা ৷ রবীন্দ্রনাথের ‘মালবিকা’ উজ্জয়িনী নগরের বাসিন্দা ৷ জীবনানন্দের ‘বনলতা’ নাটোরের ৷ নাটোর বর্তমান বাংলাদেশের একটি জনপদ ৷ জীবনানন্দের জন্ম বাংলাদেশেরই বরিশাল শহরে ৷ জন্মসূত্রে তাঁদের পরিবার হিন্দু ৷ পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন ৷ তাঁদের পরিবার বরিশালে ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনের পথিকৃৎ ৷ রবীন্দ্রনাথও ব্রাহ্ম ৷ এই খানেই হয়তো দুই কবির সমাপতন ৷

যে নাবিক হারায়েছে দিশা:-
আমি কিছু কল্পনা জোড়তে চাই ৷ কল্পনার সূত্র আমার সাম্প্রতিক লাক্ষাদ্বীপ ভ্রমণ ৷ আরব সাগরের বুকে অবস্থিত লাক্ষাদ্বীপ ৷ ভারতের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ৷ মালায়ালম ও সংস্কৃতে লাক্ষাদ্বীপের অর্থ হল “লক্ষ্য দ্বীপ” ৷ মতান্তরে, প্রাচীন ও মধ্য যুগের কিছু নাবিকের সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিল এই দ্বীপপুঞ্জের ৷ সঠিক দ্বীপের সংখ্যা তারা জানতো না ৷ ফলে লোকমুখে দাঁড়িয়েছিল লক্ষাধিক ৷ সেই থেকে অপভ্রংশ হয়ে লাক্ষাদ্বীপ ৷ সমগ্র লাক্ষাদ্বীপ ছোট ছোট দ্বীপের সমষ্টি ৷ একে অপরের কাছাকাছিতে অবস্থিত ৷ কেরালা উপকূলের থেকে কাছে পড়ে ৷ কেরালা উচ্চ-আদালতের আওতাধীন অঞ্চল ৷ লাক্ষাদ্বীপের রাজধানী কাভারত্তি ৷ এখানকার লোকেরা মালায়ালম, হিন্দি, মাহী এবং তামিল ভাষায় কথা বলে ৷ কেরালার শেষ চেরা রাজা চেরামান পেরুমলের সাথে লাক্ষাদ্বীপের ইতিহাস জড়িয়ে আছে ৷ আরব বণিকদের নির্দেশে তিনি ইসলাম ধর্মে রূপান্তরিত হন ৷ তাঁর রাজধানী ক্রাগানোর ছেড়ে দেন ৷ ক্রাগানোর বর্তমানে মক্কার কোদূঙ্গালোর নামে পরিচিত ৷ রাজার খোঁজে অনেক অনুসন্ধান চলে ৷ জাহাজে করে বিভিন্ন দলকে বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হয় ৷ একটি দল ভয়ঙ্কর ঝড়ের কবলে পড়ে ৷ তাদের জাহাজটি ভেঙ্গে পড়ে ৷ বাঙ্গারাম নামে একটি দ্বীপপুঞ্জের কাছে ৷ ঝড়ের প্রভাব কমলে দলটি আগাত্তি দ্বীপে পৌঁছায় ৷ কিছু সৈন্য নিজস্ব স্থানে ফিরে আসে ৷ কিছু সৈন্য আগাত্তিতে বসবাস করতে শুরু করে ৷
লাক্ষাদ্বীপে ইসলাম ধর্মের প্রচার করেন সন্ত উবেদুল্লাহ ৷ এই ইতিহাস সপ্তম শতাব্দীর ৷ ইসলাম ধর্মের প্রচারের জন্য তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতেন ৷ এই দ্বীপপুঞ্জের কাছে এসে তাঁর জাহাজটি একবার ভেঙ্গে পড়ে ৷ তিনি নিজেকে একটি দ্বীপে খুঁজে পান ৷ আন্দ্রোত দ্বীপে ৷ জনবসতিও দেখতে পান ৷ এখানেই বিবাহ করেন ৷ স্থানীয় মানুষদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করেন । আন্দ্রোতে তাঁর কবরটি এখনও রয়েছে ৷ একটি পবিত্র স্থান ৷ পর্তুগীজদের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে লাক্ষাদ্বীপে লুঠতরাজ শুরু হয় ৷ পর্তুগীজেরা কর্তৃত্ব স্থাপনের চেষ্টা করে ৷ কিন্তু তাদের কর্তৃত্ব বেশিদিন স্থায়ী হয় নি ৷ স্থানীয় মানুষেরা তাদেরকে বিষক্রিয়ার মাধ্যমে হত্যা করে ৷ এরপর ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে লাক্ষাদ্বীপে চিরাক্কলের রাজার রাজত্ব স্থাপিত হয় ৷ কিছু দিন পর কিছু দ্বীপপুঞ্জ টিপু সুলতানের শাসনে চলে আসে ৷ ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৯৯ সালে এখানে আবির্ভূত হয় ৷ পরবর্তীতে, ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে সমগ্র লাক্ষাদ্বীপ ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে আসে ৷ স্বাধীনতার পর, এই দ্বীপপুঞ্জ-গুলি ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের অধীনে এসে যায় ৷ ১৯৫৬ সালে লাক্ষাদ্বীপ একটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল রূপে গড়ে ওঠে । লাক্ষাদ্বীপ ৩৬-টি দ্বীপপুঞ্জের সমষ্টি ৷ মোট আয়তন প্রায় ৩২ বর্গ কিলোমিটার ৷ আরব সাগরের বুকে প্রায় ৩০,০০০ বর্গ মাইল এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই দ্বীপগুলি । আন্দ্রোত, আমিনি, আগাত্তি, বিত্রা, চেট্টলাট, কাডমট, কালপেনি, কাভারত্তি, কিলত্তন এবং মিনিকয় এই দ্বীপগুলিতে লোকজন বাস করে । বাঙ্গারামেও গড়ে উঠেছে রিসোর্ট ৷

জীবনের সমুদ্র সফেন:-
২০১৬-এর ডিসেম্বরের এল টি সি-র জন্য ছুটি নিলাম ৷ কুড়ি দিনের ছুটি ৷ ইচ্ছে জাহাজে কোচিন থেকে লাক্ষাদ্বীপে যাব ৷ পাঁচ-ছয় দিন কাটাব ৷ কিন্তু বিধি বাম ৷ ডিসেম্বর মাস ৷ বড়দিনের সময় ৷ লাক্ষাদ্বীপে প্রবেশের জন্য প্রশাসনের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নিতে হয় ৷ আগে থেকে জাহাজের সীট বুক না থাকাতে সেই অনুমতিও মিলছিল না ৷ শেষে কেরল নিবাসী আমাদের আই জি শ্রীযুক্ত কে ভি শ্রীজেশকে ধরলাম ৷ তিনি শ্রীযুক্ত ঘনশ্যামের টেলিফোন নাম্বার দিলেন ৷ আই পি এস অফিসার ৷ লাক্ষাদ্বীপের একমাত্র আই আর ব্যাটেলিয়নের কমাণ্ড্যান্ট ৷ বর্তমানে এস পি-র দায়িত্বে ৷ তাঁর সাথে কথা বললাম ৷ কিছুটা আশ্বাস মিললো ৷ প্লেনের টিকিটের ভীষণ রাশ ৷ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই টিকিট কাটলাম ৷ কোচিন থেকে আগাত্তির ৷ ২৬ শে ডিসেম্বরের ৷ ফেরার টিকিট থেকে ২৮ শে ডিসেম্বরের ৷ আগাত্তি থেকে কোচিন ৷ দিনে শুধু একটিই বিমান চলে ৷ এয়ার ইন্ডিয়ার ছোট্ট বিমান ৷ সাতাশ-আঠাশ জনের বসার আসন ৷ আমরা তিনজন ৷ আমার স্ত্রী পারমিতা ৷ ছেলে নীল ৷ আর আমি ৷ শেষ পর্যন্ত অনুমতিপত্র মিলল ৷ আগাত্তি ও বাঙ্গারাম ভ্রমণের ৷ ঘনশ্যাম সাহেব থাকেন কাভারত্তিতে ৷ তাঁর সাথে দেখা হবে না ৷ সহকারী কমাণ্ড্যান্ট মোহম্মদ রফিক আমাদের রিসিভ করবেন ৷ আগাত্তি বিমান-বন্দরে ৷

কোচিন পৌঁছলাম ২১ শে ডিসেম্বর রাত্রিতে ৷ প্রথমে দু`রাত্র কাটালাম আঙ্গমালিতে ৷ কোচিন বিমান বন্দরের লাগোয়া ‘Elite Palazzo’ হোটেলে ৷ সেখান থেকেই ট্যাক্সিতে কোচিন শহর পরিক্রমা সারলাম ৷ চেরাই সমুদ্র সৈকতেও গেলাম ৷ মধ্যে একরাত্র কাটালাম টেক্কাদিতে ৷ পথে পড়ল আলেপ্পি ৷ আসলে বছর সাতেক আগে একবার কেরালা ভ্রমণ করেছি ৷ সেবার মুন্নার, আলেপ্পি, ত্রিবান্দম, কোভালম, প্রভৃতি স্থানে দীর্ঘ সময় ছিলাম ৷ এ`বার শুধু লাক্ষাদ্বীপ যাবার আগে সময় কাটানোর মানসিকতা ৷ টেক্কাদিতে থেকে পেরিয়ার জাতীয় ব্যাঘ্র অভয়ারণ্যে যেতে হয় ৷ কিন্তু এ`বছর খরা ৷ জলাধার শুকিয়ে গেছে ৷ পার্কে ঘুরলাম ৷ স্থানটি ভালো লাগলো ৷ বড়দিনের আগে পৌঁছলাম কোভালম ৷ আমার সফেন সমুদ্র ৷ বড়দিনের দিন প্রচুর ভিড় হল ৷ বিদেশীদের সংখ্যাও চোখে পড়ার মত ৷ স্বল্প-বসনে রৌদ্রস্নান করে ত্বক ঝলসাতে ব্যস্ত ৷ মাখন-বর্ণ ত্বক তাদের পছন্দ নয় ৷ ভারতীয় শ্যামলিমার খোঁজে এখানে আসা ৷ রাত্রি সোয়া ন`টার দিকে কোভালম ত্যাগ করলাম ৷ লক্ষ সোজা কোচি বিমানবন্দর । যখন পৌঁছলাম, ঘড়িতে ভোর তিনটে ৷

সবুজ ঘাসের দেশ:-
যথা সময়েই বিমান ছাড়ল ৷ সকাল সোয়া দশটা নাগাদ ৷ আমাদের সীট পড়েছে ২ নং সাড়িতে ৷ পেছনের দরজা দিয়ে উঠতে হয় ৷ ফলে অনেকটা পথ প্যাসেজের মধ্য দিয়ে আমাদের হাটতে হলো ৷ বিমানে প্রাতরাশও মিললো ৷ আমরা সদ্ব্যবহার করলাম ৷ আমাদের গন্তব্য আগাত্তি ৷ লাক্ষাদ্বীপের একমাত্র বিমানবন্দর ৷ রাজধানী কাভারত্তিতে যেতে হয় জাহাজে কিংবা হেলিকপ্টারে ৷ আমাদের বিমান সাদা মেঘের উপরে উঠে গিয়েছিল ৷ ফলে নিচের সমুদ্র নজরে আসছিল না ৷ কিন্তু সাড়ে এগারোটা নাগাদ যখন অবতরণ করতে শুরু করল তখন অন্য চিত্র ৷ নীচে নীলচে-সবুজ আরবসাগর ৷ সমুদ্রের স্নিগ্ধ চঞ্চল উচ্ছলতা যাত্রীদের মুগ্ধ করলো ৷ আগাত্তি বিমান বন্দরটি প্রায় সমুদ্রের জলের লেভেলে ৷ বড়জোর দু`তিন ফুটের ফারাক ৷ চারিদিকটা সবুজ ঘাসের গালিচায় মোড়া ৷ বিমান থেকে নামার পর একজনই তিনতারা অফিসার নজরে এলো ৷ তাই সহকারী কমাণ্ড্যান্ট মোহম্মদ রফিককে সনাক্ত করতে অসুবিধা হলো না ৷ আমাদের সাথে একই বিমানে জম্মু-কাশ্মীরের একজন মন্ত্রী এসেছেন ৷ তিনি আমাদের দেখভালের ভার নায়েব-সুবেদার জাফরকে দিলেন ৷ আরেকজন পুলিশ অফিসার ছিলেন ৷ সি আই সাহেব ৷ তাঁর এক হাতে প্লাস্টার ৷ তিনিও মন্ত্রীর সেবায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ৷ এরাইভ্যাল লাউঞ্জে আমাদের অনেকক্ষণ বসতে হলো ৷ পারমিট এন্ট্রি করাতে যত না সময় লাগলো, মাল সংগ্রহ করতে ঘাম ছুটে গেলো ৷ তখন আবিষ্কার হলো নীলের লাগেজ আসেনি ৷ আগাত্তিতে এইটা নাকি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা ৷ স্টেশন ইন-চার্য মিঃ ভট্ট আমাদের সাথে একই বিমানে এসেছেন ৷ দু`বছর এখানে চাকুরী করবেন ৷ তিনি ফোনে কোচিতে কথা বললেন ৷ কনফার্ম করলেন ছেলের ব্যাগ কোচি বিমান বন্দরেই আছে ৷ কথা দিলেন পরের দিনের বিমানে নীলের লাগেজ অবশ্যই আনিয়ে দেবেন ৷ সরকারী অতিথিশালায় আমাদের স্থান হয় নি ৷ সেখানে মন্ত্রী থাকবেন ৷ আমরাও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলাম ৷
আগাত্তি দ্বীপটি দেখতে ‘কমা’(,) আকৃতির ৷ মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত অনুমানিক দৈর্ঘ্য সাত কিলোমিটার ৷ মোটা অংশের দৈর্ঘ্য দেড় থেকে দুই কিলোমিটার ৷ জাফর আমাদের নিয়ে গেলো একটি হোটেলে ৷ কমার মাথার দিকে ৷ সেদিকেই ড সি অফিস ৷ ফ্যাডারেল ব্যাংক ৷ পাবলিক লাইব্রেরী ৷ বাজার, দোকানপাট ৷ কংক্রিটের রাস্তা ৷ আগাত্তিতে গাড়ির সংখ্যা পনের বিশটি ৷ মোটর সাইকেল শ`তিনেক ৷ বাই-সাইকেল প্রচুর ৷ জিনিস চুরি হয় না ৷ তবে পাল্টা-পালটি হয়ে যায় ৷ টাটা-স্যুমো জাতীয় গাড়ি ৷ মিনিট দশেকের মধ্য আমরা গন্তব্যে পৌঁছেগেলাম ৷ বেলা প্রায় একটা ৷ চারিদিকে শুধু নানা উচ্চতার, নানা বয়সের নারকেল গাছ ৷ হোটেলটি দু`তলা দালান-বাড়ি ৷ একপাশে ব্যাংক ৷ দু`টি রুম এ সি ৷ একটি ডাবল-বেড এ সি রুম নিলাম ৷ ভাড়া দৈনিক আটশো টাকা ৷ আগাত্তির লোকেরা লোভী নয় ৷

দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর:-
জাফর আমাদেরকে খাবার হোটেলে নিয়ে গেলো ৷ থাকার হোটেল থেকে পায়ে-হাটা দূরত্বে ৷ হোটেলের একটি বয়ের বাড়ি আসামের কামরূপে ৷ বছর দু`য়েক হলো কেরল থেকে এখানে এসেছে ৷ সাথেই পাবলিক লাইব্রেরী ৷ একটি মিউজিয়াম ৷ না, আগাত্তিতে আমরা দারুচিনি গাছ পাই নি ৷ দারুচিনি গাছ পেয়েছিলাম টেক্কাদিতে ৷ ভেষজ গাছপালার একটি পার্কে ৷ আগাত্তিতে হোটেলের সামনেই একটি মাঝারি আকারের বটগাছ ৷ তবে প্রচুর ঝুড়ি ৷ জাফর থাকে আমাদের হোটেলের ঠিক পেছনে ৷ লাক্ষাদ্বীপে পুরুষেরা শ্বশুড়বাড়িতে থাকে ৷ এরপর আমরা একটু বিশ্রাম নিলাম ৷ বিকেল পাঁচটায় জাফরসহ গাড়ি নিয়ে ঘুরতে বেরুলাম ৷ প্রথমে আমরা গেলাম সামুদ্রিক মাছের প্রজনন এবং গবেষণা কেন্দ্রে ৷ সরকারী সংস্থা ৷ খুবই বেহাল অবস্থা ৷ আমাদের ত্রিপুরার মৎস্য দপ্তরের লোকেরা গর্ব করতে পারে ৷ তারা নিঃসন্দেহে এই কেন্দ্রীয় সংস্থাটি থেকে এগিয়ে ৷ এরপর আমরা গেলাম দ্বীপের পূর্ব-পাশের একটি জেটিতে ৷ বিহারের একটি পরিবারের সাথে পরিচয় হলো ৷ বাবা-মা ও মেয়ে ৷ আমাদের সাথে একই বিমানে আগাত্তি এসেছেন ৷ ভদ্রলোক স্টেইট ব্যাংকের অফিসার ৷ ভূপালে পোস্টিং ৷ বয়সে আমার চেয়ে কিছুটা ছোট ৷ এরপর আমরা গেলাম লাগুন সমুদ্র সৈকতে ৷

রাস্তায় অনেক পাকা বাড়ি নজরে এলো ৷ আবার নারকেল পাতায় ছাওনি কুঁড়েঘরও নজরে এলো ৷ তটভূমিটি সত্যি খুব সুন্দর ৷ চারপাশে সাদা বালি ৷ যেন সাদা লবণ ৷ সমুদ্রের জল নীলাভ ৷ কোথাও হালকা সবুজ ৷ যেখানে জল গভীর, সেখানকার জলের রং কালো ৷ এখানে সমুদ্রের উদ্দামতা নেই ৷ শুধু বাতাসের দোলায় ছোট ছোট ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে সমুদ্র সৈকতে ৷ খুবই সংযত ভাবে ৷ সূর্যাস্থের ছবি তোলার চেষ্টা করলাম ৷ কিন্তু আকাশে হালকা মেঘ থাকায় সম্ভব হলো না ৷ বীচের অদূরে জেলেরা ‘টোনা মাছ’ কাটছে ৷ এগিয়ে গেলাম দেখতে ৷ প্রচুর মাছ ধরা পড়েছে ৷ দু`তিন জন অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় ধারালো চাকু দিয়ে মাছের পেট, মাথা এবং শরীর আলাদা করছে ৷ মাছের ডিমও আলাদা করে রাখছে ৷ একপাশে নেট-দিয়ে ঘেরা মাছ শুকানোর জায়গা ৷ মাছের নাড়িভুঁড়ি গর্ত করে মাটিতে পুঁতে রাখছে ৷ এমনি তিন-চারটি দল নজরে এলো ৷ প্রতি দলে আট-দশজন জেলে ৷
ছোট ছেলেদের একটি দল এসেছে শিক্ষামূলক ভ্রমণে ৷ আশপাশের দ্বীপ থেকে ৷ তারা বীচে ফুটবল খেলছিল ৷ সমুদ্র সৈকতে কয়েকটি দোকান ৷ চেয়ার টেবিল পাতা ৷ আবার মিঃ ভট্টর সাথে দেখা হলো ৷ তিনি আবারো আশ্বাস দিলেন, পরদিন নীলের লাগেজ আনিয়ে দেবেন ৷ আমরা চা-স্ন্যাকস খেলাম ৷ এরমধ্যে জাফরের কাছে ফোন এলো ৷ সরকারী অতিথি-শালায় আমাদের জন্য একটি রুমের ব্যবস্থা হয়েছে ৷ আমরা আমাদের বর্তমান হোটেলই পছন্দ করলাম ৷ ফেরার পথে স্থানীয় দোকান থেকে নীলর জন্য কিছু পোশাক কিনলাম ৷ এখানকার স্কুলের শিক্ষার মান ভালো ৷ কেরল থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকারা ডেপুটেশনে পড়াতে আসেন ৷ মেয়েরাও সমানতালে পড়াশুনা করে ৷

অতিদূর সমুদ্রের’পর:-
বাঙ্গারাম যাবার জেঠি আমাদের হোটেল থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে ৷ জাফর আমাদের বলেছিলো সকাল আটটায় বোট ছাড়বে ৷ কিন্তু পরদিন সকাল সাতটা থেকেই তাগাদা দিতে শুরু করলো ৷ বললো, একটি স্পীড-বোট এখুনি ছাড়বে ৷ আমরাও প্রায় তৈরি ছিলাম ৷ সাড়ে সাতটায় পৌঁছে গেলাম জেটিতে ৷ সি আই সাহেবও ছিলেন সেখানে ৷ হাতে প্লাস্টার নিয়ে ৷ বললেন, দুপুরের দিকে বাঙ্গারাম যাবেন ৷ জম্মু-কাশ্মীরের অতিথিদের সাথে ৷ আমাকে মিঃ ফারুক খানের ফোন নাম্বার দিলেন ৷ মিঃ খান অবসরপ্রাপ্ত আই পি এস অফিসার ৷ তাঁর একটি সংস্থা আছে৷ বাঙ্গারাম দ্বীপের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য এবং দ্বীপকে ভিত্তি করে জল-ক্রীড়ার ব্যবস্থা করেন ৷ স্পীড-বোটে পরিচয় হলো দিল্লীর এক স্কুলের প্রিন্সিপাল ম্যাডামের সাথে ৷ ঠিক যেন বিয়াঙ্কা কাস্তাফিয়র ৷ মহিলার স্বামী এবং ছেলে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ৷ ম্যাডামের সবকিছুতেই উৎসাহ ৷ এর আগে কাভারত্তি ঘুরে এসেছেন ৷ সকালে বাই-সাইকেলে আগাত্তি দ্বীপ টহল দিয়েছেন ৷ আমরা চারজনই যাত্রী ৷ তিনজন নাবিক ৷ নীল নির্জন । শুধু মোটর-বোটের আওয়াজ ৷ মাঝিরা ডাবের জল খাওয়ালো ৷ শেষে ডাবের শ্বাস ৷ এক সময় আমাদের পাশ দিয়ে একটি বোট বেরিয়ে গেলো ৷ ছাত্রদের এক্স-কারসনের দল ৷ আমরা হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানালাম ৷ তাদের গন্তব্য মনে হলো অন্যত্র ৷ ঘণ্টা-খনেকের মধ্য আমরা বাঙ্গারম পৌঁছেগেলাম ৷

মিঃ ফারুক খান আমাদের জন্য জেঠীতেই দাঁড়িয়েছিলেন ৷ বয়স হয়েছে ৷ কিন্তু দেখতে তাঁকে ভীষণ ফিট লাগে ৷ বাঙ্গারাম দ্বীপ আগাত্তি থেকেও ছোটো ৷ আগাত্তির আকৃতির যদি হয়ে থাকে কমার মত, বাঙ্গারামের আকৃতি সেমিকোলনের(https://www.facebook.com/images/emoji.php/v6/f57/1/16/1f609.png;) মত ৷ সেমিকোলনের বিন্দীর মত আরেকটি ছোট দ্বীপ পরেলি ৷ খুবই কাছে ৷ জন-মানব হীন ৷ পাখিদের দ্বীপ ৷ পাখিরা সেখানে নির্ভাবনায় বাস করে ৷ বাঙ্গারাম আগাত্তি থেকে সুন্দর ৷ নারকেল ও অন্যান্য গাছের ছায়ায় অপেক্ষাকৃত সবুজ ৷ জনবসতি কম বলে নির্জন ৷ প্রকৃতি তার ডালি উজাড় করে দিয়েছে ৷ সমুদ্রতটের বালুকা-বেলার কাছ ঘেঁসে কিছু পর্ণকুটির ৷ সাথে সব আধুনিক সুবিধা ৷ বিলাসবহুল থাকার ব্যবস্থা ৷ টার্গেট বিদেশী এবং এন আর আই ৷ আমরা বাফেটে প্রাতরাশ সারলাম ৷

এবার জলক্রীড়ার পালা ৷ চেরা রাজা চেরামান পেরুমলের খোঁজে বেরিয়েছিল একদল নাবিক ৷ তাদের জাহাজ ডোবে গিয়েছিল বাঙ্গারাম দ্বীপের অদূরে ৷ জল সেখানে অগভীর ৷ জাহাজটিতে এখন মাছ এবং সামুদ্রিক প্রাণীর বাস ৷ জাহাজের ধ্বংসাবশেষকে ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছে স্নরকেল ডাইভিং এর ব্যবস্থা ৷ সাবমেরিনে টিউব অথবা চোঙের সাহায্যে শ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা থাকে ৷ এরই অনুকরণে স্নরকেল ডাইভিং ৷ সাথে স্নরকেল মাস্ক ৷ মাছ পাখনা ৷ মোটর বোটে করে যেতে হয় ৷ তট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্ব ৷ সেখানেই অগভীর জলে ডোবে যাওয়া জাহাজের ধ্বংসাবশেষ ৷ এবার আমাদের বোটে বিয়াঙ্কা কাস্তাফিয়র ছাড়াও আরো চারজন ৷ নীলের বয়সী একটি ছেলে ৷ তার বাবা ও মা ৷ ব্যাঙ্গালুরু থেকে এসেছেন ৷ আরেকজন মহিলা ৷ এন আর আই ৷ আমেরিকা প্রবাসী ৷ মহিলার স্বামী এবং দুই ছেলে বাঙ্গারাম দ্বীপে সারাদিন জলে পড়ে থাকে ৷ স্কুবা-ডাইভিং এর কোর্স করছে ৷ তিন দিনের কোর্স ৷ স্কুবা-ডাইভিং চার কেজি ওজনের অক্সিজেন সিলিন্ডার, স্কুবা মাস্ক, ডাইভিং মাস্ক, স্কুবা মাস্ক চাবুক, স্কুবা পাখনা, ডুব পাখনা, ডাইভিং পাখনা ইত্যাদি নিয়ে করতে হয় ৷ আমাদের মত যারা আনাড়ি তাদের একটু ট্রেনিং দিয়ে তিন থেকে ছ`মিটার জলের গভীরে নিয়ে যাওয়া হয় ৷ সাথে একজন সাহায্যকারী অভিজ্ঞ ডুবুরি ৷ অন্য একজন ডুবুরি ছবি তোলে ৷ স্কুবা ডাইভিং কোর্স করার পর সাহায্যকারী ছাড়াই একজন ডুবুরি সর্বোচ্চ আঠার মিটার অবধি জলের গভীরে ডোব দিতে পারে ৷ গ্লাসবটম বোট ৷ যেতে যেতে নীচের নীল জল নজরে আসছিল ৷ ধ্বংসের মধ্যেই প্রাণ ৷ জলেডোবা জাহাজেই রঙিন মাছেদের বাস ৷ জলতলের রঙিন প্রবালদ্বীপ ৷ আমাদের আশেপাশে নির্ভয়ে সামুদ্রিক জলজ প্রাণীরা ঘোরাফেরা করছে ৷ প্রায় একঘণ্টা আমরা সেখানে কাটালাম ৷ এরই মধ্যে বিয়াঙ্কা কাস্তাফিয়র কান্নাকাটি শুরু করলেন ৷ তাঁর হাতে নাকি জেলিফিশ কামড়ে দিয়েছে ৷ ভিনিগার লাগাতে হবে ৷

ডাঙ্গায় নেমেই তিনি হম্বিতম্বি শুরু করলেন ৷ মোটর বোটে ভিনিগার নাই কেন? কর্তৃপক্ষ ভিনিগারের ব্যবস্থা করলেন ৷ শেষে আবিষ্কার হলো, ভদ্রমহিলার বাঙ্গারাম দ্বীপ ভ্রমণের অনুমতি তখনো মঞ্জুর হয় নি ৷ সবাই ভেবেছিলো তিনি আমাদের গ্রুপের সদস্য ৷ ইতিমধ্যে জম্মু-কাশ্মীরের মন্ত্রীও হেলিকপ্টরে এসে পৌঁছেছেন ৷ সবাই তাঁকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ৷ সি আর পি এফের বাহিনীও নজরে এলো ৷ আমরা এবার স্কুবা ডাইভিং করতে নামলাম ৷ প্রথমে আমরা যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নিলাম ৷ তারপর জলে নামলাম ৷ দেখা গেলো, সাঁতার না জানলে স্কুবা ডাইভিং সহজ হয় ৷ স্কুবা ডাইভিং-এ মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হয় ৷ আবার মুখ দিয়েই শ্বাস ছাড়তে হয় ৷ মুখে সাগরের নোনাজল ঢোকে গেলে অস্বস্থি লাগে ৷ পারমিতার স্কুবা ডাইভিং সবচেয়ে ভালো হলো ৷ আবার প্রত্যক্ষ করলাম জলচরদের অবাক জীবন ৷ সমুদ্রের উপরের পৃথিবীর চেয়ে যেন নীচের পৃথিবী আরো সুন্দর ৷ অনেকদিন আগে পড়া নটরাজনের একটি গল্প মনে এলো ৷ গল্পটির নাম ভুলে গেছি ৷ চোখের সামনে প্রতিভাত হলো প্রবালরাজ্য ৷ অসম্ভব সুন্দর ৷ রঙিন ৷ ভাষায় বর্ণনা করা যায় না ৷ হয়তো পান্নার মতো ৷ হয়তো চুন্নির মতো ৷ মার্বেলের মতো । কিংবা রক্তপ্রবালের মতো ৷ সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে শতশত রঙিন মাছ ৷ সিন্ধুঘোটক ৷ নাম না জানা সামুদ্রিক প্রাণী ৷ সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো ৷

নীল আরো কিছু ওয়াটার স্পোর্টসে অংশগ্রহণ করলো ৷ মধ্যাহ্ন ভোজনের তখনো কিছুটা দেরি ছিল ৷ বালির ওপরে বিশ্রাম চৌকিতে আধশোয়া হয়ে বিশ্রাম নিলাম ৷ মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি মিললো ৷ দুপরের খাবার পর ভাটা শুরু হলো ৷ অনেকে পায়ে হেঁটে দ্বীপ পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়লো ৷ বলা-বাহুল্য বিয়াঙ্কা কাস্তাফিয়র সবার আগে ৷ ব্যাংকের ভদ্রলোকও পরিবারসহ পরেলি দ্বীপ হয়ে বাঙ্গারামে পৌঁছেছেন ৷ সেই দ্বীপে স্নরকেল ডাইভিং উপভোগ করেছেন ৷ সমুদ্রবেলায় বসে আমরা তাঁদের সাথে গল্প করে কাটালাম ৷ বিকাল চারটের কিছু পরে বোটে চাপলাম ৷ ইচ্ছে ছিলো পরেলি দ্বীপে নামার ৷ কিন্তু ভাটার কারণে নৌকা দ্বীপে ভিড়তে পারলো না ৷ আমাদের বাঙ্গারাম দ্বীপের অন্য একটি পাশে নিয়ে গেল ৷ ভাটার কারণে জল নেমে গেছে ৷ দু`টি লোক সমুদ্রবেলায় এক ধরনের কেঁচো ধরছিলো ৷ টোনা মাছের আধার ৷ ধরার কায়দা অবিকল শিক দিয়ে কুঁচিয়া মাছ ধরার মতো ৷ পথে আমাদের একটি ডলফিন মনোরঞ্জন করলো ৷ মোটর বোটে যাতায়তের ভাড়া পাঁজ হাজার টাকা ৷ বিয়াঙ্কা কাস্তাফিয়র তাঁর শেয়ার আমাদেরকে মিটিয়ে দিলেন ৷

হোটেলে এসে দেখলাম নীলের লাগেজ পৌঁছে গেছে ৷ রাত্রিতে আগাত্তি কিছুটা ঘুরে দেখলাম ৷ পরদিন সকালেও ঘুরে বেড়ালাম ৷ লাগুন সৈকতে গেলাম ৷ এখানকার লোকজনেরা দেখতে কিছুটা কালো ৷ চেহারায় বেশ শার্পনেস আছে ৷ মোটামুটি আকর্ষণীয় চেহারা ৷ বিশেষ করে চোখগুলি সুন্দর ৷ ছাগল, গরু এবং মুরগী প্রতিপালন করে ৷ ছাগল-গরুকে কি খাওয়ায়, কিছুটা বিষ্ময়ের ৷ ফুল লতাপাতার বৈচিত্র্য কম ৷ লোকেরা সচ্ছল ৷ ইলেক্ট্রিসিটি আছে ৷ ডিজেল জেনারেটরের বিদ্যুৎ ৷ যথাসময়ে ফেরার বিমানে চাপলাম ৷ মোহম্মদ রফিকের কাছে মিঃ ঘনশ্যামের জন্য আমার ‘I Adore’ বইয়ের একটি কপি দিলাম ৷ একটি ক্যালেন্ডার উপহার পেয়েছিলাম ৷ কাজে লাগলো ৷ জাহিরকে দিলাম ৷ সাথে তার দুই বাচ্চার জন্য চকোলেট ৷

বিম্বিসার অশোকের ধুসর জগতে:-
এ`বার জীবনানন্দে ফিরে আসি ৷ কবি তাঁর কবিতায় বিম্বিসার অশোকের ধুসর জগতের প্রসঙ্গ এনেছেন ৷ পাশাপাশি সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগরে ভ্রমণের কথাও বলেছেন ৷ সম্রাট অশোক পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শাসকদের একজন ৷ দাসপ্রথা রোধ, মৃত্যুদন্ড রোধ, বনায়নের উপর গুরুত্ব, নারীপুরুষের সমতার গুরুত্ব ইত্যাদি ছিল তাঁর কিছু যুগান্তকারী প্রয়াস ৷ তাঁর সাম্রাজ্য পূর্বে আসাম ও বাংলাদেশ, পশ্চিমে ইরান ও আফগানিস্তান, উত্তরে পামীর থেকে প্রায় সমগ্র দক্ষিণ-ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল ৷ সত্যিকার অর্থে তাঁর মনের পরিবর্তন আসে কলিঙ্গ যুদ্ধের পর ৷ খ্রিস্টপূর্ব ২৬১ দয়া নদীর ধারে ধৌলি পাহাড়ের কাছে এই যুদ্ধ হয় ৷ ভীষণ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ৷ যুদ্ধে ১,০০,০০০ কলিঙ্গসেনা এবং ১০,০০০ মৌর্যসেনা নিহত হয় ৷ অসংখ্য নর-নারী আহত হয় ৷ যুদ্ধের বীভৎসতা সম্রাট অশোককে বিষাদময় করে তোলে ৷ তিনি যুদ্ধের পথ ত্যাগ করেন ৷ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন ৷ অহিংসা-নীতি পত্তন করেন ৷ দেশে-বিদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে উদ্যোগী হন ৷ তাঁর পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রাকে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য শ্রীলংকা পাঠান ৷ কাশ্মীর, গান্ধার, কোংকন, মহারাষ্ট্র, নেপাল, থাইল্যান্ড, ব্রহ্মদেশ, লাক্ষাদ্বীপ প্রভৃতি স্থানেও যায় ৷ লাক্ষাদ্বীপ সেই যুগেও ছিলো ৷

প্রশ্ন হলো জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় উপরের প্রসঙ্গ আনলেন কেন ৷ ‘বনলতা সেন’ কি মানবী ছিলেন? ‘বনলতা’ ছাড়াও তিনি শ্যামলী, সুরঞ্জনা, সুচেতনা, সরোজনী, সুজাতা, অমিতা ইত্যাদি নারী চরিত্রের সৃষ্টি করেছেন ৷ কিন্তু অন্যদের নিয়ে এতো কথা হয় নি ৷ অনেকেই বনলতা সেনকে রক্ত মাংসের মানুষ হিসাবেই কল্পনা করেছেন ৷ প্রখ্যাত গবেষক ডা. ভূমেন্দ গুহ উল্লেখ করেছেন, কবির জীবনে প্রেম এসেছিলো ৷ সেই মেয়ের নাম শোভনা ৷ কবির কাকা অতুলান্ত দাশের মেয়ে ৷ কবির জায়া লাবণ্য দাশ ৷ তাঁকে বিয়ে করার আগে শোভনার প্রতি জীবনানন্দ অনুরক্ত ছিলেন ৷ শোভনই কি বনলতা? লাবণ্য দাশের সাথে তাঁর দাম্পত্যজীবন সুখের ছিলো না বলেও প্রকাশ ৷
তবু কল্পনা করতে দোষ কি? বিশেষত: বাঙ্গারামের মতো স্বপ্নের দ্বীপে ভ্রমণ করে এসে ৷ ‘বনলতা সেন’ কোনো মানবী ছিলেন না ৷ প্রকৃতিরই রূপ ৷ নাটোরের প্রকৃতি ৷ বন ও লতা ৷ নদী, মাঠ, ঘাট, নৌকা আর তাঁর গাংচিল ৷ কবি বলেছেন, পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন ৷’ পাখির নীড় বন এবং লতাপাতার মধ্যেই থাকে ৷ তাই এই তুলনা ৷ কোনো এক দিনশেষে প্রকৃতির নিবিড় ছায়ায় তিনি শান্তি অনুভব করেছিলেন ৷ আর কবিমানস জন্ম দিয়েছিল এই বিখ্যাত কবিতার ৷


Wednesday, 4 January 2017

দক্ষিণ রায়ের দেশে…..


  



 ‘কহে মা বনবিবি কোথা রইলে এই সময়,
   জলদি করে এসে দেখ তোমার দুঃখে মারা যায় ৷
   কড়ার দিয়েছো মাগো যদি না পালিবে,
   ভাটি মধ্যে তোমার কলঙ্ক রয়ে যাবে ৷’

উপরের এই পঙক্তিগুলি ‘বনবিবির পাঁচালি’ থেকে নেওয়া ৷ বনবিবির কাহিনী খানিকটা এই ধরনের ৷ বঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলে এক নিষ্ঠুর রাজা ছিলেন ৷ দক্ষিণ রায় ৷ তিনি বাঘের রূপ ধরতে পারতেন ৷ খোদার ইচ্ছা দক্ষিণ রায়কে শায়েস্তা করা ৷ কিন্তু কিভাবে শায়েস্তা করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না ৷ একদিন তাঁর নজর পড়লো এক সন্তানহীন দরবেশ ইব্রাহীমের উপর ৷ তাঁর স্ত্রী ফুলবিবি ৷ খোদা  ফুলবিবির সম্মতি নিয়ে ইব্রাহীমের দ্বিতীয় বিয়ে দিলেন ৷ গুলাল বিবির সাথে ৷ তবে ফুলবিবি বিশেষ শর্ত রাখলেন ৷ গর্ভধারণের পর গুলাল বিবিকে জঙ্গলে একা রেখে আসতে হবে ৷ সেই শর্ত পালিত হলো ৷ গুলাল বিবিকে ছেঁড়ে আসা হল গভীর জঙ্গলে ৷ সেখানে তিনি জন্ম দিলেন দুই সন্তানের ৷ বনবিবি ও শাহ জঙ্গলি ৷ খোদার কল্যাণে তারা বেঁচে রইলো ৷
 
সাত বছর পর ইব্রাহীমের মনে অনুশোচনা এলো ৷ তিনি গুলাল বিবি ও তাঁর দুই সন্তানকে মক্কায় নিয়ে এলেন ৷ একদিন বনবিবি আর শাহ জঙ্গলি নবিজীর মসজিদে প্রার্থনা করছিলেন ৷ খোদা তখন তাদের কাছে বিশেষ এক টুপি পাঠালেন ৷ ওই টুপি মাথায় পরামাত্র তারা বঙ্গের দক্ষিণাঞ্চলে পৌঁছে গেলেন ৷ সুন্দরবন অঞ্চল ৷ সেখানে দক্ষিণ রায়ের শাসন চলছে ৷ সুন্দরবনে পৌঁছে শাহ জঙ্গলি একদিন আযান দিচ্ছিলেন ৷ এই আযান দক্ষিণ রায়ের সহ্য হলো না ৷ তিনি তাঁর ভাই সনাতন রায়কে পাঠালেন বনবিবি আর শাহ জঙ্গলিকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে ৷ দুই পক্ষে লড়াই হলো ৷ দক্ষিণ রায়দের সাথে পিশাচ আর ভূত ৷ বনবিবি আর শাহ জঙ্গলির সাথে তাঁদের পোষা কুমীর ৷ লড়াইয়ে দক্ষিণ রায়ের পক্ষ হেরে গেলো ৷ সাথে তাঁরা হারালেন রাজত্বের অর্ধেক অংশ ৷ দক্ষিণ রায় সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলে চলে গেলেন ৷

এর পরের ঘটনা ৷ ধোনা আর মনা দুই ভাইকে নিয়ে ৷ তারা সুন্দরবনের জঙ্গলে মধু আর মোম সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে ৷ একবার ধোনা আর মনা গিয়েছে গভীর জঙ্গলে ৷ মধু আর মোম সংগ্রহ করতে ৷ সাতটি নৌকা নিয়ে ৷ সাথে দুখী নামে একটি কিশোর ৷ যেখানে গিয়েছে, সেই অংশে দক্ষিণ রায়ের শাসন ৷ তাঁরা দক্ষিণ রায়ের জন্য কোনো উপহার তারা আনেনি ৷ তাই মোম-মধু পাচ্ছিলো না ৷ একরাতে দক্ষিণ রায় ধোনাকে স্বপ্নে দেখা দিলেন ৷ বললেন, দুখীকে বলি দিতে হবে ৷ লোভী ধোনা বলি হিশেবে দুখীকে জঙ্গলে বেধে রেখে আসলো ৷ এদিকে বাড়ি থেকে রওয়ানা দেবার আগে দুখীর মা বলেছিলেন বিপদে পরলে সে যেনো বনবিবিকে স্মরণ করে ৷ রাত্রিতে দক্ষিণ রায় বাঘরূপে দুখীকে খেতে আসলেন ৷ দুখী তখন মনেপ্রাণে বনবিবিকে ডাকছিল ৷ বনবিবি তার ডাক শুনে ভাইকে নিয়ে এসে বাঘরূপি দক্ষিণ রায়কে পরাস্ত করলেন ৷ তাঁকে বাধ্য করলেন ধোনা, মনা আর দুখীকে সাত নৌকা বোঝাই করে মোম আর মধু দিতে ৷ ফেরার সময় বনবিবির পোষা কুমীর তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলো ৷ এই ঘটনার পর থেকে সুন্দরবন অঞ্চলে বনবিবি'র পুজো শুরু হয় ৷ বনবিবি সুন্দরবনের অধিষ্ঠাত্রী ৷ কাল্পনিক পীরানি ৷ হিন্দুদের বনদুর্গা ৷ মধ্যযুগ থেকে লোকসমাজ হিংস্র জীবজন্তুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য বনবিবির পূজা করে আসছে ৷ তাঁদের নিকট মানত করে ৷ শির্নী দেয় ৷

২০১৬ সালের বছরের শেষ দিনে দক্ষিণ রায়ের দেশে যাওয়া নিতান্তই হঠাৎ করে ৷ এল টি সি নিয়ে গিয়েছিলাম লাক্ষাদ্বীপে ৷ ইচ্ছে ছিল জাহাজে কোচিন থেকে লাক্ষাদ্বীপে যাব ৷ পাঁচ-ছয় দিন কাটাব ৷ কিন্তু বিধি বাম ৷ ডিসেম্বর মাস ৷ বড়দিনের সময় ৷ লাক্ষাদ্বীপে প্রবেশের জন্য প্রশাসনের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নিতে হয় ৷ আগে থেকে জাহাজের সীট বুক না থাকাতে সেই অনুমতিও মিলছিল না ৷ আমাদের এক অবসরপ্রাপ্ত আই জি শ্রীযুক্ত এন রাজেন্দ্রণ স্যার থাকেন এর্নাকুলমে ৷ তিনি বললেন কোচিন পর্যন্ত টিকিট বুক করে ফেলতে ৷ সেই অনুযায়ী ২১ শে ডিসেম্বরের টিকিট নিলাম ৷ তারপর কেরল নিবাসী আমাদের আরেকজন আই জি শ্রীযুক্ত কে ভি শ্রীজেশের সহায়তায় লাক্ষাদ্বীপের আগাত্তি ও বাঙ্গারামে ২৬ থেকে ২৮ শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘুরে বেড়ানোর অনুমতি পেলাম ৷ কুড়ি দিনের ছুটি ৷ ভাবলাম পরের কিছুদিন গোয়া এবং গুজরাটে ঘুরে বেড়াব ৷ কিন্তু সেক্ষেত্রেও কোনো সুবিধা হলো না ৷ কোচিন থেকে কোনো এরোপ্লেন কিংবা ট্রেনের সুবিধাজনক সময়সূচী মিলল না ৷ তখনই মনে এলো সুন্দরবনের কথা ৷ তাছাড়া কলকাতা আমাদের যাতায়তের পথে পড়ে ৷ সাথে সাথে কথা বললাম বদন কিতাবের এক বন্ধু অরিজিৎ রায় চৌধুরীর সাথে ৷ এছাড়া আমাদের ডি এস পি রনদেব দাসকেও ফোন করলাম ৷ সুন্দরবনে বেড়ানোর জন্য একজন ট্যুর অপারেটর ঠিক করে দেওয়ার জন্য ৷ দুজনেই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা ৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই শঙ্কর রায় নামে এক ভদ্রলোক ফোন করলেন ৷ দু`জনেই তাঁকে ফোন করেছেন ৷ অদ্ভুত সমাপতন ৷ শঙ্করবাবু বললেন বছরের শেষ ৷ এই সময়েই সুন্দরবনে পর্যটকদের ভিড় ৷ থাকার জায়গা পাওয়া খুবই সমস্যা ৷ ত্রিশ, একত্রিশ এবং এক তারিখ অর্থাৎ দুই রাত্র, তিন দিনের প্যাকেজ অফার করলেন ৷ আমার স্ত্রী পারমিতা ও ছেলে নীলকে নিয়ে একটি ঘরে থাকতে হবে ৷ দিনের বেলা নৌকায় সফর ৷ খাবার সহ মাথাপিছু খরচ পড়বে সাড়ে তিন-হাজার টাকা ৷ আমাদেরকে ক্যানিং থেকে পিক আপ করবে ৷ সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেলাম ৷ কিছু পরে শঙ্করবাবু আবার ফোন করলেন ৷ বললেন, ত্রিশ, একত্রিশ এবং এক তারিখের পরিবর্তে একত্রিশ, এক এবং দুই তারিখে ব্যবস্থা হবে ৷ আবারো রাজি হলাম ৷ ঠিক করলাম আঠাশ তারিখেই কলকাতায় ফিরব ৷ মধ্যে একদিন বোলপুরে যাব ৷


এই পরিকল্পনা নিয়েই এগোলাম ৷ আঠাশ তারিখে একটা নাগাদ আগাত্তি থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে কোচিন পৌঁছলাম ৷ ঘণ্টা খানেকের আকাশ যাত্রা ৷ তারপর কোচিন থেকে মুম্বাই হয়ে কলকাতার বিকেল চারটে পাঁচের জেটের ফ্লাইট ধরলাম ৷ মুম্বাইতে বিমান পাল্টাতে হয় ৷ লক্ষ্ণৌ থেকে বিমান আসতে দেরি হওয়ায়, আমাদের বিমানও দেরিতে ছাড়ল ৷ কলকাতায় পৌঁছলাম রাত্র সোয়া দশটা নাগাদ ৷ নির্ধারিত সময়ের আধ-ঘণ্টা পর ৷ উঠলাম সল্ট-লেকের ২ নং ত্রিপুরা ভবনে ৷ পরদিন সকালে আবার শঙ্করবাবুর ফোন ৷ বললেন, আগে যে প্যাকেজ অফার করেছিলেন তা গ্রুপের হিসাবে ৷ আমাদের তিনি গ্রুপে সফর করাতে চান না ৷ নব-বর্ষের সময় ৷ বিভিন্ন ধরনের হুজ্জতি হতে পারে ৷ আমাদের জন্য একটি আলাদা বোটের ব্যবস্থা করবেন ৷ সাথে সারাক্ষণের জন্য একজন গাইড ৷ কুমারেশ বিশ্বাস ৷ সে ক্যানিং থেকে আমাদের সঙ্গ দেবে ৷ মাথাপিছু খরচ সাড়ে চারহাজার টাকা ৷ বললাম, তথাস্তু ৷ তবে দুই তারিখে বোটে ঘুরব না ৷ প্রাতরাশের পর ফিরে আসব ৷ কারণ আগরতলায় ফেরার বিমান ধরবো ৷ তিনি সানন্দে রাজি হলেন ৷ শিয়ালদহ থেকে একত্রিশে ডিসেম্বর দুপুর একটা চল্লিশের ক্যানিং লোকাল ট্রেন ধরতে বললেন ৷ গাইড কুমারেশ বিশ্বাসের মোবাইল নাম্বার দিলেন ৷

৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ যথা সময়ে আমরা শিয়ালদহ থেকে ক্যানিং লোকালে চাপলাম ৷ প্রচণ্ড ভিড় ৷ বসার দুটো সীট ম্যানেজ হলো ৷ ট্রেন ছাড়ার আগে ফেইসবুকের মিতা অরিজিৎ রায় চৌধুরী এসে হাজির ৷ সাথে বেশ কয়েকটি মিষ্টির প্যাকেট ৷ ভদ্রলোক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে চাকুরী করেন ৷ আমার লেখার একজন সংবেদনশীল পাঠক ৷ কিছুক্ষণ চলার পর ট্রেন কিছুটা ফাঁকা হলো ৷ তিনজনেই বসতে পারলাম ৷ পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার পথ ৷ তিনটে নাগাদ ক্যানিং পৌঁছলাম ৷ কুমারেশ বিশ্বাসের সাথে মোবাইলে যোগাযোগ করলাম ৷ সে স্টেশনের টিকিট কাউন্টারের পাশে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল ৷ রবীন্দ্রনাথের কৃষ্ণকলির পুরুষ রূপ ৷ প্রথম পরিচয়েই সে আমাদের আপন করে নিলো ৷

এ`বার আমরা অটোতে চাপলাম ৷ সাথে অবশ্যই কুমারেশ ৷ বত্রিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে অটো থামল গদ-খালিতে ৷ চা-পানের বিরতির পর আমরা চলতে শুরু করলাম ৷ পায়ে হেঁটে ৷ মাতলা নদীর ঘাট ৷ নদী এখানে অনেকটা প্রশস্থ ৷ কম করে এক কিলোমিটার ৷ নদীর অপর পাশে গোসাবা ৷ কিছুটা দূরে মাতলার সাথে এসে মিশেছে বিদ্যা নদী ৷ মাতলা নদীর ঘাট, বিদ্যা নদীর ঘাট এবং গোসাবার ঘাট, অনেকটা সমকোণী সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের সৃষ্টি করেছে ৷ মাতলার ঘাট থেকে বিদ্যা নদীর ঘাট এবং বিদ্যা নদীর ঘাট থেকে গোসাবার ঘাটের দূরত্ব প্রায় সমান ৷ আবার মাতলার ঘাট থেকে গোসাবার ঘাটের দূরত্ব অতিভুজ বরাবর ৷ তাই একটু বেশি ৷ মোটর যুক্ত ডিঙ্গি নৌকায় পারাপারের ব্যবস্থা ৷ মাতলার ঘাট থেকে বিদ্যার ঘাট হয়ে গোসাবা গেলে সময় বেশি লাগে ৷ তবে ভাড়া কম ৷ মাথা পিছু দু`টাকা ৷ বাই-সাইকেলও দু`টাকা ৷ মোটর সাইকেল পারাপারের ভাড়া কুড়ি টাকা ৷ আর স্পেশালে মাথা পিছু তিন টাকা ৷ স্পেশাল বোট মাতলার ঘাট থেকে গোসাবার ঘাটের মধ্যে সরাসরি চলাচল করে ৷ ত্রিভুজের দুই বাহুর দৈর্ঘ্যের যোগফল তৃতীয় বাহু থেকে বেশি ৷ এক্ষেত্রে তাই সময় কম লাগে ৷ আমরা স্বল্প-খরচে বিদ্যা-বোঝাই হয়ে গেলাম ৷

গোসাবার রাস্তাঘাট সরু সরু ৷ ভারী গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত নয় ৷ ঘাটের সাথেই বাজার ৷ পাশে গোসাবা থানা ৷ এবার আমরা যাব গাড়িতে পাখিরালা ৷ দশ কিলোমিটার পথ ৷ কুমারেশ গাড়ির ড্রাইভারের সাথে ফোনে যোগাযোগ করল ৷ ড্রাইভার কিছুটা দূরে ছিল ৷ কুমারেশ বলল পাশেই রবীন্দ্র স্মৃতি বিজড়িত ‘বেকন বাংলো’ ৷ একশত বছরেরও আগে সুন্দরবনের গোসাবায় প্রায় নয় হাজার একর জমি কেনেন স্কটল্যান্ডের স্যার ড্যানিয়েল হ্যামিল্টন ৷ সেখানে তিনি গড়ে তুলেন সমবায় সমিতি, ব্যাঙ্ক, চালকল, ইত্যাদি ৷ এক টাকার নোটও চালু করেছিলেন গোসাবায় ৷ দুই দশকের চেষ্টায় চেহারা বদলে গিয়েছিল মাতলা ও বিদ্যা নদীর লাগোয়া বেশ কয়েকটি গ্রামের । তাঁর ভূমি সংস্কার ও পঞ্চায়েতরাজের ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৷ মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী ৷ পরে তিনি স্কটল্যান্ডে ফিরে যান ৷ তাঁর পরিবারের সদস্যরা থাকতেন দুইটি বাংলোয় ৷ ‘বেকন বাংলো’ ও ‘হ্যামিল্টন বাংলো’ ৷ প্রায় এক কিলোমিটার ব্যবধানে ৷

হ্যামিলটন সাহেবের আমন্ত্রণে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গোসাবায় এসেছিলেন ২৯ ডিসেম্বর, ১৯৩২ সালে ৷ আমাদরই মতো শিয়ালদহ থেকে ৷ পায়ে হেঁটে ‘বেকন বাংলো’-য় পৌঁছে দেখলাম তালা ঝুলছে ৷ বাংলোর চত্বরে রবীন্দ্রনাথের বিরাট মূর্তি ৷ বেশ জীর্ণ অবস্থা ৷ মাটি থেকে চার-পাঁচ ফুট উঁচুতে বাংলোর মেঝে ৷ মূল কাঠামো সেগুন কাঠের ৷ আমি মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর বাংলোও দেখেছি ৷ আমাদের রাজ্যের মালঞ্চ নিবাসের অবস্থা সবার জানা ৷ ত্রিপুরা পুলিশের ‘কফি টেবল্ বুক’-এর জন্য ছবি সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখেছি আগরতলার অনেকেরই সংগ্রহে রয়েছে বিরল সব কিউরিও ৷ অনেক কিছুর সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে ৷ কেন জানি মনে হয় পশ্চিম বাংলা কিংবা ত্রিপুরা কোনোখানেই আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে পারছি না ৷ এক্ষেত্রে শান্তিনিকেতন কিছুটা ব্যতিক্রম ৷

রবীন্দ্রনাথের মূর্তির নীচে বড় করে লেখা কবিগুরু ১৯৩২-এর ৩০শে ডিসেম্বর থেকে ৩১ শে ডিসেম্বর কাটিয়েছিলেন এই বাংলোয় ৷ আমরা যখন বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে তখন তারিখ ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১৬ সাল ৷ কাটায় কাটায় চুরাশি বছরের ব্যবধান ৷ রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয় এই বাংলোয় বসে কোনো গান কিংবা কবিতা লিখেছিলেন ৷ যদিও আমার জানা নেই ৷ মাতলা নদীর বুকে বছরের শেষ সূর্য ডুবতে দেখে একটি কবিতার পঙক্তিই মনে এলো :
 ‘দিবসের শেষ সূর্য
 শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল
 পশ্চিম সাগর তীরে
 নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়-
 কে তুমি?
 পেলনা উত্তর ৷’

এ`বার আমরা একটি অটো ভ্যানে চাঁপলাম ৷ কংকীটের রাস্তা ৷ সরল রেখায় ৷ একটির সাথে অন্যটি প্রায় জায়গাতেই সমকোণে মিশেছে ৷ যেন আয়তক্ষেত্রের বাহু ৷ ফলে বাঁক নিতে গিয়ে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা ৷ বেশ ঘন-বসতি ৷ অধিকাংশই অ্যাসবেস্টসের ছাউনি ৷ কিছু দালান বাড়ি ৷ প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে ছোট্ট পুকুর কিংবা ডোবা ৷ কিচেন গার্ডেন ৷ মাঠে ধান কাটা শেষ হয়েছে মাড়াই চলছে ৷ এক জায়গায় খ্রীষ্টানেরা বড়দিন উপলক্ষে মেলার আয়োজন করেছে ৷ নববর্ষের দিন অবধি সেটা চলবে ৷ কুমারেশের বয়স চৌত্রিশ ৷ সে কলিকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ের স্নাতক ৷

বাঘ দেখতে পাব কি না বলায় সে সুন্দরবনের ব্যপকতার কথা বললো ৷ তার কথায় প্রায় ছাব্বিশ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সুন্দরবন ৷  এর মধ্যে বন প্রায় দশ হাজার বর্গ-কিলোমিটার জুড়ে ৷ আক্ষরিক অর্থে সুন্দর জঙ্গল ৷ সুন্দরী গাছ থেকে এর নামকরণ হয়ে থাকতে পারে৷ বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চল ৷ পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও তাদের অসংখ্য শাখা-নদীর অববাহিকার বদ্বীপ ৷ নদীনালা, খাঁড়ি, বিল মিলিয়ে জলাকীর্ণ এই অঞ্চল ৷ রয়েল বেঙ্গল টাইগার ছাড়াও নানান ধরণের পাখি, চিত্রা হরিণ, কুমির ও সাপসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল এই সুন্দরবন ৷ এর প্রায় দুই তৃতীয়াংশ বাংলাদেশে ৷ খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালি ও বরগুনা জেলায় ৷ ভারতের অংশ পশ্চিমবঙ্গে ৷ দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা জেলায় ৷ কুমারেশের কথায় বুঝতে পারলাম দক্ষিণা রায় আন্তর্জাতিক সীমানার ধার ধরেন না ৷ সুন্দরবনের বেশিরভাগ অংশ যেহেতু বাংলাদেশে সেখানেই বাঘেদের থাকার সম্ভাবনা বেশি ৷ তবে সে জানালো অক্টোবরের দিকে একবার কাছাকাছি এলাকায় বাঘ দেখা গিয়েছে ৷

কুমারেশ ২০০৯ সালের মে মাসের আয়লা ঝড়ের কথা তুলল ৷ বলল, আয়লা তাদের অঞ্চলকে পঁচিশ বছর পিছিয়ে দিয়েছে ৷ জলপ্লাবন এবং নোনা জলের প্রবেশের ফলে অধিকাংশ তিন-ফসলি জমি এক-ফসলি হয়ে গেছে ৷ গ্রামের বিদ্যুতায়নের প্রসঙ্গও তুলল ৷ বছর দেড়েক হল তাদের এলাকায় বিজলীবাতি জ্বলছে ৷ এই গল্প করতে করতেই আমরা পাখিরালা পৌঁছলাম ৷ পাখির আলয় থেকে পাখিরালা ৷ এক সময় এখানে প্রচুর পরযায়ী পাখি আসত ৷ আমাদের থাকার স্থান ‘হোটেল বনফুল’ ৷ হোটেল মালিক সন্তোষ কুমার রায় ৷ অবসর প্রাপ্ত বনকর্মী ৷ দোতালা বাড়ি ৷ সব মিলিয়ে আটটি ঘর ৷ সাথে অ্যাটাচ্ড বাথরুম ৷ সন্তোষবাবু খুবই কর্মঠ ৷ তাঁর মেয়ের জামাই প্রবীরই ব্যবসা দেখে ৷ প্রবীর কুমারেশের সমবয়সী ৷ বন্ধু ৷ সে-ই শঙ্কর রায় এবং আমাদের মধ্যে যোগসূত্র ৷ এমনকি কুমারেশও শঙ্কর রায়কে কখনো দেখেনি ৷ প্রবীরের কথায় আমাদের সাথে জুড়ে গিয়েছে ৷ হোটেলের সব-কয়টি রুমে আবাসিক ৷ হোটেল থেকে একশো মিটার দূরে জেঠি ৷ সেখানে মোটরবোট দাঁড়ানো ৷ অন্যদের রান্না বোটে হবে ৷ খাবার হোটেলে পরিবেশিত হবে ৷ আমাদের রান্না সন্তোষবাবুর ঘরে ৷ এক বিঘা জমির উপর হোটেল এবং বাড়ি ৷ সামনে একটি সুন্দর লন ৷ পাশেই সন্তোষবাবুর ছেলের হোটেল ৷ সব মিলিয়ে গোটা এলাকায় পঞ্চাশটির মত হোটেল ৷

আমাদের রুম দোতালায় ৷ চলনসই ব্যবস্থা ৷ তখন সন্ধ্যা, হালকা শীত ৷ কুমারেশরা জানতে চাইল আমরা কি টিফিন করতে চাই ৷ ঝাল-মুড়ি পছন্দ করলাম ৷ আমাদর সাথে মরণচন্দ্রের চানাচুর ছিল ৷ সেগুলিরও সদ্ব্যবহার করলাম ৷ রাতের খাবারে মাংসের পরিবর্তে মাছ পছন্দ করলাম ৷ ভেটকি মাছ, ডাল এবং বেগুন ভাজা ৷ রাত্রি সাড়ে আটটার দিকে ঝুমুর নাচের একটি দল হোটেলের লনে পারফর্ম করবে ৷ একটু ফ্রেস হয়ে নিচে নামলাম ৷ উদ্দেশ্য সন্তোষ রায়ের সাথে গল্প করা ৷ কেরলের এক দম্পতির সাথে পরিচয় হল ৷ ভদ্রলোক স্যাম্পসন কোম্পানিতে চাকুরি করেন ৷ ত্রিশ বছরের উপর শিলিগুড়িতে আছেন ৷ আমার পরিচিত জায়গা ৷ কিছু গল্প করলাম ৷ তাঁদের মেয়ে এসে যোগ দিল ৷ মেয়ে ইঞ্জিনিয়র ৷ কলকাতায় চাকুরি করে ৷ তাঁরা দুপুরের পর থেকে বোটে করে ঘুরে এসেছেন ৷ হরিণ, গোসাপ এবং কয়েক প্রজাতির পাখির দেখা পেয়েছেন  মন ভরেনি ৷ পরদিন আবার বেরুবেন ৷

সন্তোষ রায়ের কর্ম-জীবন তেত্রিশ বছরের ৷ পুরোটাই কেটেছে সুন্দরবনে ৷ ফরেস্ট গার্ড হিসাবে চাকুরিতে যোগ দিয়েছিলেন ৷ অবসরের আগে একটি পদোন্নতি পান ৷ অনেকবার দক্ষিণ রায়ের মুখোমুখি হয়েছেন ৷ তাঁর কথায় বাঘের চেয়ে সুন্দরবনের জলদস্যুরা খতরনাক ৷ জলদস্যুদের কাছেও ফরেস্ট গার্ডদের মত থ্রি নট থ্রি বন্দুক থাকে ৷ একাধিকবার জলদস্যুদের মোকাবিলা করতে হয়েছে ৷ সুন্দরবনের বাঘ কখনো সামনা-সামনি আক্রমণ করে না ৷ চোখা-চোখি হলে ধীরলয়ে পালিয়ে যায় ৷ তাই সুন্দরবনে চলার সময় জেলে, মধু সংগ্রহকারী, কাঁকড় শিকারীরা মাথার পেছন দিকে মুখোশ লাগিয়ে রাখে ৷ তাছাড়া বনবিবির নিকট মানত করে ৷ একটি পুরুষ বাঘ অনেকটা এলাকা নিয়ে রাজত্ব করে ৷ সাধারণত শীত পড়তে শুরু করলে সঙ্গিনীর খোঁজে বেরোয় ৷ অনেক সময় লোকালয়ে আসে ৷

এরপর কুমারেশ এলো আমাদের ঘরে ৷ তার সাথে আরেক প্রস্থ গল্প করলাম ৷ সে-ও সন্তোষবাবুর কথার পুনরাবৃত্তি করলো ৷ তাঁর এক বন্ধুর বাঘের মুখ থেকে বেঁচে ফিরার গল্প শোনালো ৷ ঘটনা বিগত মার্চের ৷ কয়েকজন মিলে গিয়েছিল মধু সংগ্রহে ৷ কখন যে বাঘ ছেলেটিকে তুলে নয়ে গিয়েছে সাথীদের খেয়াল ছিলো না ৷ ছেলেটির অদম্য সাহস এবং প্রাণশক্তি ৷ তার পরনে ছিলো জিন্সের ট্রাউজার ৷ বাঘের থাবা পড়েছিলো ছেলেটির ট্রাউজারের উপর ৷ ফলে বাঘের নখ ঠিকভাবে মাংসের উপর চেপে বসেনি ৷ বাঘ চেষ্টা করছিল ছেলেটির ঘাড়ে কাঁমড় বসাবার ৷ ছেলেটি একটি হাত দিয়ে বাঘের চোয়াল প্রতিহত করছিল ৷ এই অবস্থায় বাঘ তাকে ম্যানগ্রোভ বনের ভিতর দিয়ে জঙ্গলের গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল ৷ আর ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূলে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিল তার দেহ ৷ সে তখন অন্য হাত দিয়ে প্যান্টের বোতাম খুলে দিল ৷ মুহূর্তে বাঘ তাকে উলঙ্গ করে জিন্সের ট্রাউজার নিয়ে ছুঁটল ৷ ছেলেটি তার শরীরের শেষ শক্তি সঞ্চয় করে বন্ধুদের ডাকলো ৷ বন্ধুরা তাকে না পেয়ে তখন চলে যাওয়ার মুডে ছিলো ৷

ইতিমধ্যে নীচ থেকে ঝুমুর নাচের ডাক এলো ৷ আমরা সবাই গিয়ে বসলাম লনে ৷ অন্য ট্যুরিস্টরাও এলো ৷ পাঁচজন নর্তকী ৷ একজন গায়িকা ৷ সবাই লাল-পাড় শাড়িতে ৷ পায়ে ঘুঙ্গুরু ৷ একজন ঢোলক বাদক ৷ প্রায় সবগুলি গানই 'বলি ও ননদী আর দুমুঠো চাল ফেলে দে হাঁড়িতে, ঠাকুরজামাই এল বাড়িতে...’ গানের সুরে ৷ কিছু ট্যুরিস্টও নাচের সাথে পা মেলালো ৷ শিল্পীদের অক্লান্ত চেষ্টা সত্বেও নাচ সেই মাত্রা পেলো না ৷ তথাপি উৎসাহের জন্য অনেকেই পুরস্কার দিলো ৷ আমরা দিলাম একশত টাকা ৷ ঘণ্টা খানেক অনুষ্ঠান করে দলটি অন্য হোটেলে চলে গেলো ৷

পরদিন সকালে কাটায় কাটায় আটটায় আমরা বেরুলাম হোটেল থেকে ৷ সাথে গাইড কুমারেশ ৷ জটিতে অনেকগুলি নৌকা ৷ ছোট বোটগুলির নামের আগে এম বি ৷ সম্ভবতঃ মোটর বোট ৷ বড়গুলির নামের আগে এম ভি ৷ মোটর ভ্যাসেল ৷ আমাদের বোটের নাম এম বি ইউনিক্ ৷ পনেরো বিশ জন চড়তে পারে ৷ দুইজন মাঝি ৷ সমর খাঁটুয়া ৷ শ্যামল দাস ৷ প্রথমে আমরা গেলাম পাশের একটি ঘাটে ৷ সেখানে বাজার বসে ৷ কুমারেশ দুপুরের খাবারের জন্য ভাঙ্গন মাছ, গলদা চিংড়ি ও বেগুন কিনে আনলো ৷ এরপর আমরা গেলাম সজনেখালি ৷ মিনিট পনেরর জলপথ ৷ সজনেখালিতে বন-বিভাগের অফিস ৷ সেখান থেকে সুন্দরবনে ঘোরার অনুমতিপত্র নিতে হয় ৷ পাশে একটি পার্ক ৷ একটি হ্যান্ডিক্র্যাফ্টের দোকান ৷ পারমিতা কিছু স্যুভেনির কিনলো ৷ বেশ বড়ো লাইন ৷ কুমারেশের অনেক্ষণ সময় লাগলো অনুমতিপত্র সংগ্রহ করতে ৷ এরপর আমরা ঢুকলাম পার্কে ৷ দোতালা দালান ঘর ৷ বাইরে একটি পুকুর ৷ পুকুরে কুমীর ৷ ঘরের ভিতর ছবি এবং মুর্তির মাধ্যমে সুন্দরবনের প্রাণী এবং উদ্ভিদের বৈচিত্র্য তুলে ধরা হয়েছে ৷

দশটা নাগাদ আমরা আসল সফর শুরু করলাম ৷ ততক্ষণে মাঝিরা আমাদের প্রাতঃরাশের জন্য লুচি ও আলুরদম তৈরি করে ফেলেছে ৷ কুমারেশ সার্ভ করলো ৷ দিগন্ত বিস্তৃত জলরশি ৷ যেদিকে তাকাই নদী আর খাড়িই নজর আসে ৷ ম্যানগ্রোভ প্রজাতির সুন্দরী গাছ । এছাড়া গেওয়া, কেওড়া, গরান আর ধুন্দল গাছ ৷ শুধু ধুন্দলেই এখন ফল এসেছে ৷ এই ধুন্দল ঝিঙ্গে জাতীয় ধুন্দল থেকে আলাদা ৷ ফল খাদ্যের পর্যায়ে পড়ে না ৷ শন, নলখাগড়া, গোলপাতার মতো গাছও নজরে এলো ৷ তবে কোথাও মিশ্র বন নেই ৷ যেন এক একটি ব্লক ৷ যেখানে সু্দরী গাছ, সেখানে সবই সুন্দরীর বন ৷ যেখানে কেউড়া সেখানে সবই কেউড়া ৷ ফুল বলতে গেলে একদমই নেই ৷ কুমারেশ বললো বসন্তে ফুল ফুটবে ৷ তখনই মধু সংগ্রহের মরশুম ৷ পাখির মধ্যে বক, মাছরাঙ্গা এবং ফিঙ্গে নজরে এলো ৷ প্রাতঃরাশের একটু পরেই একটি কুমীরের দেখা পেলাম ৷ বেশ বড় আকারের ৷ আবার বিকেলে ওই এলাকাতেই আরেকটি কুমীর দর্শন দিল ৷ হয়তো একই কুমীরকে দু`বার দেখেছি ৷ তখন ভাটা ৷ এক জায়গায় গাছের গোড়াতে মাটি সরে গিয়ে কিছু পোঁড়ামাটির বাসনপত্র বেরিয়ে এসেছে ৷ কুমারেশ বললো, পুরাতনী সভ্যতার নিদর্শন ৷ খুব একটা কনভিন্সিং মনে হলো না ৷ সন্ধ্যায় হোটেলে ফিরে আসার আগে ফরেস্টের আরো দু`টি পার্কে গেলাম ৷ এক জায়গায় হরিণ পেলাম ৷ এক জায়গায় গোসাপ ৷ সুন্দরবনের প্রায় প্রতিটি অঞ্চল উঁচু নেট দিয়ে ঘেরা ৷ বনও ভীষণ ঘণ ৷ এর ফাঁক গলিয়ে দক্ষিণা রায় আমাদের দেখতে আসবেন, সম্ভাবনা ক্ষীণ ৷ ফেরার পথে জঙ্গলে একটি হরিণ এবং তার শাবককে দেখতে পেলাম ৷

দুপুরের খাবার তোফা হয়েছিলো ৷ খাওয়ার পর কেবিনের ভিতর কিছুটা ভাতঘুম দিলাম ৷ তারপর ফ্রেশ হয়ে কুমারেশের সাথে গল্প করতে বসলাম ৷ কুমারেশেরা দুই বোন এক ভাই ৷ বাবা কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের কাঁমড়ে মারা যান ৷ তখন কুমারেশের বয়স তিন ৷ মা-ই তিন ছেলে-মেয়েকে মানুষ করেন ৷ বোনেদের বিয়ে হয়ে গিয়েছে ৷ তার এক ছেলে, এক মেয়ে ৷ মেয়েটি ক্লাস এইটে পড়ে ৷ ছেলেটি ছোট ৷ মা পঞ্চায়েতের সদস্য ৷ স্ত্রী বারোয়ারী অনুষ্ঠানে রান্না করে ৷ সে ট্যুর অপারেটর হিসাবে কাজ করে ৷ ছ`তারিখে একটি বড় দল আসবে ৷ তখন মা ও স্ত্রী-সহ ঝাপিয়ে পড়বে অতিথি সেবায় ৷ অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সুন্দরবনে পর্যটনের মরশুম ৷ অন্য সময়ে বিভিন্ন ট্যুর অপারেটরের গাইড হিসাবে অন্যান্য রাজ্যে যায় ৷ এভাবেই সে উত্তর ভারত এবং গুজরাট ঘুরে এসেছে ৷

     ‘এখানে দক্ষিণ রায় ভাটির ঈশ্বর
      নানা শিষ্য কৈল সেই বনের ভিতর ৷’

কুমারেশ একবারই দক্ষিণ রায়ের খপ্পরে পড়তে গিয়েছিল ৷ সেবার সে বন-দপ্তরের একটি দলের সাথে জঙ্গলে ক্যাম্প করছিলো ৷ বনকর্মীদের খুবই সাহস ৷ একদিন সকাল নটার দিকে পাঁচজন মিলে গিয়েছে খাড়িতে মাছ ধরতে ৷ দু`জনে জাল পেতেছে ৷ আর তিনজন জলের উজানে মাছ খেঁদানোতে গিয়েছে ৷ তিনজনের দলে কুমারেশ ৷ তার মনে ভয় ৷ হঠাৎ জঙ্গলে গাছের ডাল-ভাঙ্গার শব্দ ৷ সে দ্রুত নৌকায় ফিরে আসে ৷ তার পেছন পেছন বাকি দু`জন ৷ যারা জাল ধরেছিলো ততক্ষণে গুঁটাতে শুরু করেছে ৷ জালে ক্যাম্পের লোকদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত মাছই ধরা পড়েছে ৷ তাই তারা সবাই খুশি ৷ নৌকা ঘুরিয়ে ফিরে আসার সময় কুমারেশ লক্ষ করলো কিছু একটা সাতরে খাড়ি পার হচ্ছে ৷ কিছুক্ষণ আগে যেখানে তারা জল কাপাচ্ছিল, ঠিক সেই স্থানে ৷ কুমারেশ একজন বয়স্ক গার্ডকে জিজ্ঞেস করল, ‘জ্যেঠা, কিতাগো ইটা?’
-   কিচ্ছুনা, মামা নদী পার হয় !

আরেকবার সে বিপদে পড়েছিল ৷ তখন সজনেখালিতে একটি পুলিশ ক্যাম্প ছিল ৷ সেদিন বিকালে ক্যাম্পের আবাসিকদের সাথে কুমারেশ ভলিবল খেলছিল ৷ ঠিক ‘বেকন বাংলো’-র কাছে দিনে-দুপুরে ডাকাতি করে জলুদস্যুর মোটর বোটে পালাচ্ছিল ৷ ক্যাম্পে এই খবর পৌঁছামাত্র পুলিশ কর্মীরা বোট নিয়ে তল্লসীতে বেরুলো ৷ কুমারেশ এবং কয়েকজন উৎসাহী যুবকও তাদের সঙ্গ নিল ৷ তখন সন্ধ্যা ৷ একটি খাড়ির মুখে পুলিশের দলটি জলদস্যুদের বোটটিকে খুঁজে পেল ৷ জলুদস্যুরা তাদের নৌকা খাড়ির ভিতর ঢুকিয়ে দিলো ৷ পুলিশ বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ করলো ৷ কিন্তু দুস্কৃতিরা থামলো না ৷ একজন পুলিশ কর্মী একটি জোরালো টর্চ লাইট দস্যুদের নৌকার উপর ফেলছিল ৷ দস্যুরা এই সুযোগ নিলো ৷ আলোর উৎস বরাবর গুলি চালিয়ে দিলো ৷ পুলিশ কর্মীটি গুলিবিদ্ধ হয় ৷ পরক্ষণেই জলদস্যুরা সাতরে খাড়ির পারে চলে যায় এবং জঙ্গলের আড়াল থেকে পুলিশ বোটের দিকে গুলি চালাতে থাকে ৷ পুলিশ দলটি ফিরে আসতে বাধ্য হয় ৷ আহত পুলিশ কর্মীটি পরে মারা যায় ৷

রাজনীতি নিয়ে কুমারেশের মনে কোন ক্ষেদ কিংবা দুঃখ নেই ৷ তবে তার মনে অন্য একটি সুপ্ত দুঃখ আছে ৷ একটি ছেলের সাথে তার বন্ধুত্ব হয়েছিল ৷ তারই সমবয়সী ৷ ছেলেটির বাড়ি বিহারে ৷ সে পোলান্ডের একটি দলকে নিয়ে এসেছিলো সুন্দরবনে ৷ তাদের উদ্দেশ্য ছিল সুন্দরবনের উদ্ভিদের উপর ডকুমেন্টারি করা ৷ কুমারেশ তাদের পরামর্শ দেয় সুন্দরবনের বাঘ ও কুমীরের আক্রমণে আহত লোকদের নিয়ে ছবি করতে ৷ দলটি সেই প্রস্তাব লুফে নেয় ৷ শুটিং হয় ৷ কুমারেশ সাহায্য করে ৷ তার বন্ধু পোলান্ড ঘুরে আসে ৷ এরপর দু`জনে ব্যবসা শুরু করে ৷ সফল ব্যবসা ৷ ছেলেটি কুমারেশের মাকে মা ডাকত ৷ কুমারেশও তার মাকে মা ডাকত ৷ কিন্তু হঠাৎ করে জানতে পারে ছেলেটি সজনেখালি অঞ্চলে জায়গা কিনেছে ৷ রিসর্ট খুলবে বলে ৷ কুমারেশ মনে আঘাৎ পায় ৷ সে তার পরিচিত গন্ডির বাইরে যেতে চায় না ৷ তাদের মধ্যে কোনো ঝগড়া হয় না ৷ কিন্তু এক সময় আবিষ্কার করে একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে ৷

মাঝিরা সেদিন আট দিনের মাথায় ঘরে ফিরেছিল ৷ এর আগের সাত দিন তারা জেলে ডিঙ্গিতে ছিল ৷ তাদেরকে কছু বকশিস দিলাম ৷ বকশিস পেয়ে তারা খুব খুশি ৷ দ্বিতীয় রাত্রিতে রুটি এবং স্থানীয় রামপাখির মাংস খেলাম ৷ পরদিন প্রাতঃরাশে রুটি এবং আলুরদম ৷ সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ আমরা পাখিরালি ত্যাগ করলাম ৷ কুমারেশ আমাদেরকে গঁদখালি পর্যন্ত সঙ্গ দিল ৷ এবার আমরা স্পেশালে চড়ে মাতলা নদী অতিক্রম করলাম ৷ সে আমাদের ক্যানিং এর অটোতে তুলে দিলো ৷ বিচ্ছেদের আগে ওর পকেটে পাঁচশো টাকার একটি নোট গুঁজে দিলাম ৷ বললাম, বাচ্চাদের কিছু কিনে দিও ৷


Tuesday, 6 December 2016

আবার সেই ইদ্রিসের বাপ!



মেঘনাদবাবুর প্রিয় সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায় ৷ 'ফেলুদা' আর 'প্রফেসর শঙ্কু'-র তিনি ভক্ত ৷ পাশাপাশি সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্পগুলিও তাঁর প্রিয় ৷ বিশেষ করে ‘অসমঞ্জবাবুর কুকুর’ গল্পটি তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ৷ অসমঞ্জবাবু এক নির্বান্ধব মানুষ৷ অফিসে কাজ করেন ৷ অফিসের বাইরে কারো সাথে খুব একটা মেশেন না ৷ তবে কুকুর তাঁর প্রিয় ৷ একটি নেড়ি কুকুর পালেন ৷ নাম ব্রাউনি ৷ ব্রাউনি স্বাভাবিক কুকুর নয় ৷ সে মজার কথা শুনলে হাসে ৷ মজার ঘটনা দেখলে হাসে ৷ ব্রাউনির এই বিচিত্র আচরণ কেউ বিশ্বাস করেনা ৷ অসমঞ্জবাবুর কুকুর যে হাসে সেই কথা ঘটনাচক্রে এই খবর বেরিয়ে গেল খবরের কাগজে ৷ প্রচুর মানুষের আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হল ব্রাউনির হাসি ৷ কিন্তু ব্রাউনি কারণ ছাড়া হাসে না ৷ এক বিদেশী ভদ্রলোক ব্রাউনিকে কেনারও ইচ্ছা প্রকাশ করলেন ৷ অনেক টাকা অফার করলেন ৷ কিন্তু অসমঞ্জবাবু ব্রাউনিকে বিক্রি করতে রাজি হলেন না ৷ সাহেবের টাকার গরম কাজে এল না ৷ সাহেব ব্যর্থমনোরথ হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন ৷ তাই দেখে, ব্রাউনি পেছন থেকে হাসতে থাকল ৷

গত পরশু রাত্রে গল্পটি মেঘনাদবাবুর মনে এল ৷ মেঘনাদবাবুও কুকুর পোষেন ৷ তাঁর কুকুরের নাম বাঘা ৷ বাঘা কিছুটা মোটা হয়ে গেছে ৷ রাত্রিতে ঘুমালে নাক ডাকে ৷ পরশু ছিল রবিবার ৷ মেঘনাদবাবু ঘরে একাই ছিলেন ৷ পাশে ফ্লোরে তার বিছানায় বাঘা ঘুমচ্ছিল ৷ রাত তখন আনুমানিক দেড়টা ৷ হঠাৎ মেঘনাদবাবুর ঘুম ভেঙ্গে গেল ৷ ঘরের ভিতর ইংরেজিতে কেউ কিছু পড়ছে, ‘হুয়েন হি এরাইভড্ হি সো দ্য চিল্ড্রেন প্লেয়িং ইন দ্য গার্ডেন ..... ‘হুয়াট আর ইউ ডুয়িং হিয়ার?’ হি ক্রাইড ইন এ ভেরি গ্রাফ্ ভয়েস, এণ্ড দ্য চিল্ড্রেন রেন অ্যাওয়ে.....৷’

অস্কার ওয়াইল্ডের ‘স্বার্থপর দৈত্যের গল্প’ ৷ মেঘনাদবাবু মাধ্যমিকে পড়েছেন ৷ এক সময় পুরোটা মুখস্থ ছিল ৷ তিনি বিছানায় ওঠে বসেন ৷ তখনই অসমঞ্জবাবুর কুকুরের গল্পটি মনে আসে ৷ তাঁর মনে হয় বাঘারও অসমঞ্জবাবুর কুকুরের মত গুণ আছে ৷ কান পেতে শোনার চেষ্টা করেন ৷ তাঁর ওঠে বসার আওয়াজে বাঘারও ঘুম ভেঙ্গে যায় ৷ এবার তিনি বাথরুম হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েন ৷ কিছুটা ঘাপটি মেরে থাকেন ৷ বাঘা আবার নাক ডাকাতে থাকে ৷ এবার অন্য সুরে ৷ যান্ত্রিক সুর ৷

পরদিনও এই ঘটনার রেশ মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেন না ৷ তাঁকে বেশ আনমনা দেখায় ৷ ভাস্করবাবু তাঁর সহকর্মী ৷ বয়সে ও পদে তাঁর থেকে কিছুটা ছোট ৷ সন্ধ্যার পর সে এসেছে তাঁর রুমে ৷ দু`জনে একসাথে একটি বিয়ে বাড়িতে যাবেন ৷ প্রণয়বাবুর মেয়ের বিয়ে ৷ দু`জনেই প্রণয়বাবুর সাথে কাজ করেছেন ৷ অবশ্য আলাদা আলাদা ৷ তাঁর মনের অস্বস্থি ভাস্করের নজর এড়ায় না ৷ সে কারণ জানতে চায় ৷ মেঘনাদবাবু তাঁর গতরাতের অভিজ্ঞতা খুলে বলেন ৷ জানান যে ইন্টারনেট ঘেঁটেও এর সদুত্তর কিংবা পুষ্টি পাননি ৷ কুকুরের বিচিত্র সব নাসিকা-গর্জনের উল্লেখ আছে ৷ ইংরেজি গল্প পড়ার উল্লেখ নেই ৷

ভাস্কর হেসে বলে, ‘স্যার, কথাটা আপনার কাছে কাকতালীয় শোনাবে! প্রণয়বাবুর নাসিকা-গর্জন শোনেও আমি একবার আপনার মত হতবিহবল হয়েছিলাম ৷ বছর চারেক আগে আমরা দু`জন গিয়েছি নতুন দিল্লীতে ৷ নর্থ ব্লকে একটি তদন্ত ছিল ৷ বিভাগীয় তদন্ত ৷ এই সূত্রে তথ্য সংগ্রহ ৷ সাক্ষীকে জেরা ৷ প্রণয়বাবু তদন্তকারী অফিসার ৷ আর আমি তত্ত্বাবধায়ক ৷ আমরা উঠেছিলাম রাজকুমার টিকেন্দ্রজিৎ মার্গে, দিল্লীর ত্রিপুরা ভবনে ৷ একই রুমে দু`টি আলাদা আলাদা বেডে থাকার ব্যবস্থা ৷ এর বছর খানেক আগে প্রণয়বাবু ভীষণ এক দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ওঠেছেন ৷ অন্ধকারে স্কুটার নিয়ে একটি দাঁড় করিয়ে রাখা ট্রাকের পেছনে ঢুকে গিয়েছিলেন ৷ মাথায় হেলমেট ছিল ৷ তা সত্ত্বেও গুরুতর চোট আসে ৷ নাক কিছুটা বেঁকে যায় ৷ তখনও ঔষধ ব্যবহার করতেন ৷

তখন রাত্রি প্রায় দশটা ৷ খাওয়ার পর প্রণয়বাবু মেঝেতে ফাইল খুলে বসলেন ৷ বিশালাকারের ফাইল ৷ বাবু হয়ে বসে কাগজপত্র মেলাচ্ছিলেন ৷ পিঠের পেছনে একটি বালিশ ৷ সোফার গদি ৷ মাঝে মাঝে নাকে ন্যাসাল ড্রপ দিচ্ছিলেন ৷ আলাদা আলাদা ঔষধ ৷ একেকবার দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েন ৷ সাথে নাসিকা-গর্জন ৷ কিন্তু অদ্ভুত সুরেলা ৷ যেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের রাগিণী ৷ আবার ওঠে পড়েন ৷ নতুন ড্রপ দেন ৷ আবার নতুন সুর ৷ একবার মনে হল, 'এ্যায় মেরে জোহরা জবী...'এর সুর । আরেকবার যেন, 'এক চতুর নার, বড়া হোশিয়ার…’৷ কখনো যেন, ‘কার মঞ্জীর রিনিঝিনি বাজে…’ এর সুর ৷ ততক্ষণে আমার কান ঝালাপালা অবস্থা ৷ যতই সুরেলা শোনাক, আমার ঘুম লাটে উঠল ৷ পরদিন ত্রিপুরা ভবনের কর্তৃপক্ষকে বলে অন্য রুম নিলাম ৷’
- আবার সেই ইদ্রিসের বাপ!
- সেটা আবার কি স্যার ৷
- ইন্টারনেট ঘেঁটে একটি জোকস পেয়েছি ৷ এক মাওলানা এক গ্রামে ওয়াজ করছেন ৷ তিনি বললেন মৃত্যুর পর যে সব পুরুষ বেহেশতে যাবে তারা সেখানে হুর পরী পাবেন ৷ ভাল ভাল খাবার পাবেন ৷ যা চাইবেন তাই পাবেন ৷ এই অবস্থায় ওই মাহফিলেরই এক মহিলা হুজুরকে প্রশ্ন করলেন বেহেশতে নারীরা কি পাবে ?
এমন প্রশ্নে হুজুর একটু বিব্রত হয়ে পড়লেন ৷ তাঁর এই বিষয়ে জানা ছিল না ৷ তিনি একটু ভেবে উত্তর দিলেন, ‘সেখানে নারীরা তার স্বামীকে ফিরে পাবে ৷’
এই শোনে এক মহিলা চেচিয়ে বলে উঠলেন : আবার সেই ইদ্রিসের বাপ !

পুনশ্চঃ ইদ্রিসের বাপের মেঘনাদবাবুর মত নাক ডাকে ৷


Sunday, 27 November 2016

জনার্দনদা



পুলিশের চাকুরীতে যোগ দিয়ে আমার একটি অসুবিধা হয়েছে ৷ রকে বসে কিংবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে পারিনা ৷ অজান্তেই লোকেরা তদন্তের কাজে এসেছি ভেবে বসে ৷ অনেকে আবার অবসরে এসেছি কিনা প্রশ্ন করে ৷ ছ`সাত বছর আগের কথা ৷ আমি তখন পুলিশ সদরে কাজ করি ৷ সারাদিন বাজেট, ফাইল পত্রের মধ্যে ডোবে থাকি ৷ রাত্রি আটটার আগে বেরুতে পারি না ৷ তাই অনেকদিন অফিসের পর দু`এক কিলোমিটার হাঁটার চেষ্টা করি ৷ উদ্দেশ্য খোলা হাওয়ায় শ্বাস নেওয়া ৷ আগরতলা শহরে প্রচুর স্ট্যান্ডিং ক্লাব আছে ৷ অজান্তেই লক্ষ করলাম সপ্তাহে অন্তত দু`তিন দিন একটি স্ট্যান্ডিং ক্লাবে দাঁড়িয়ে পড়ছি ৷ আড্ডাস্থলের পাশে বেশকিছু দোকান ৷ বিশেষ করে একটি স্টেশনারি-কাম-পান-সিগারেটের দোকানের কথা বলতেই হয় ৷ মধ্যরাত্রির পরও খোলা থাকে ৷ অনেক পরিচিত জনই পান কিংবা সিগারেট কিনতে আসে ৷ আমাকে ওই পরিবেশে দেখে অবাক হন ৷ কুশল মঙ্গল জিজ্ঞেস করেন ৷ যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি ৷

একদিন এক ভদ্রলোক আমার স্ত্রীর নাম নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সে কেমন আছে ৷ আমার স্ত্রী ডাক্তার ৷ ভদ্রলোকের পরিচিত ৷ তিনি দেখতে একটু কালো ৷ বেটে-খাটো ৷ একটু ভুঁড়ি আছে ৷ তাম্বূল-রঞ্জিত ঠোট ৷ বয়সে আমার চেয়ে বড় ৷ পান কিনতে পাশের দোকানে এসেছিলেন ৷ আমার পরিচিত নন ৷ আমি তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পান খাওয়ার নেশা কি জন্মসূত্রে না কর্মসূত্রে?’
তিনি হেসে উত্তর দিলেন, ‘কর্মসূত্রে, নর্থে পোস্টিং এর সময় ৷
আমিও সেটাই আঁচ করেছিলাম ৷ কারণ ভদ্রলোকের গলায় কুমিল্লার ভাষা ৷ ত্রিপুরায় সিলেটীরা পান খায় জন্মসূত্রে ৷ অন্যরা কর্মসূত্রে ৷ ইতিমধ্যে, স্ট্যান্ডিং ক্লাবের অন্যরাও তাঁকে নিয়ে পড়েছে ৷ সবাই দেখলাম তাঁকে জনার্দনদা বলে সম্বোধন করছে ৷ ভদ্রলোক পেশায় ডাক্তার ৷ অবসরপ্রাপ্ত ৷ ক্রমে তাঁর সম্বন্ধে আরো জানলাম ৷ জেনে ভীষণ পুলকিত হলাম ৷ একদিন তিনি আমারও জনার্দনদা হয়ে গেলেন ৷

তখন তিনি সবে ডাক্তারি পাশ করেছেন ৷ লোকসেবা আয়োগের পরীক্ষা দিয়ে সরকারি চাকুরীও পেয়ে গেলেন ৷ সত্যি-কথা বলতে কি জনার্দনদার নাম ছিল তালিকার একদম উপরে ৷ তিনি আশা করেছিলেন তাঁর পোস্টিং শহরে কোথাও হবে ৷ কিন্তু তাঁর পোস্টিং হল উত্তর জেলার এক প্রত্যন্ত জনপদে ৷ জম্পুই পাহাড়ের পাদদেশে ৷ একটি ডিসপেনসারিতে ৷ এখনো সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অপ্রতুল ৷ প্রায়ই বর্ষায় ধস নামে ৷ রাস্তার অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ৷ আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয় ৷ রোগীর ভিড় কম ৷ তাঁর সময় মোটামুটি ভালোই কাটছিল ৷ ইতিমধ্যে এক ভদ্রলোকের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে ৷ অবসরপ্রাপ্ত ফৌজি ৷ পাহাড়ের উপরে একটি কটেজে থাকেন ৷ আর সকাল থেকেই রাম গেলেন ৷ রোগীর ভিড় কমে গেলে জনার্দনদাও তাকে সাহচর্য দেন ৷

তখন শীতকাল ৷ দপ্তরের এক উচ্চ আধিকারিক গেলেন তাঁর ডিসপেনসারি পরিদর্শনে ৷ সাথে তাঁর পারিষদ ৷ চমক দেবার জন্য সফর ৷ জনার্দনদা তখন বন্ধুর কটেজে ৷ কম্পাউন্ডার বলল, ‘স্যার, একটি কলে গেছেন ৷
তাঁর অবর্তমানে আধিকারিকেরা রেকর্ডপত্র দেখলেন ৷ ডিসপেনসারির আশপাশ ঘুরে দেখলেন ৷ দেখে খুশি হলেন ৷ বাইরে সুন্দর রোদ্দুর ৷ ডিসপেনসারির চেয়ার-টেবিল বাইরে নিয়ে এসে বসলেন ৷ এমনকি ডাক্তারবাবুর চেয়ারও তখন বাইরের উঠানে ৷ খবর পেয়ে, কিছুটা সময় নিয়ে জনার্দনদা এলেন ৷ এসেই রাগের সাথে তর্ক শুরু করলেন আধিকারিকদের সাথে ৷ ‘স্যার, আপনাদের কি আক্কেল শরম নেই? ফার্নিচারগুলি বাইরে নিয়ে এসেছেন? আমার এখানে না আছে ক্লাস ফোর ৷ না আছে জি ডি এ ৷ এইগুলি এখন কে ঢোকাবে?’

তাঁর এই মূর্তি দেখে আধিকারিকেরা ঘাবড়ে গেলেন ৷ সবাই দাঁড়িয়ে পড়লেন ৷ এবার জনার্দনদা নিজেই হাত লাগালেন ৷ চেয়ার-টেবিলগুলি ঘরে ঢোকাতে শুরু করলেন ৷ তাঁর দেখাদেখি আধিকারিকেরাও হাত লাগালেন ৷ পরিদর্শন লাটে ওঠলো ৷ আধিকারিকেরা চলে গেলে জনার্দনদা বললেন, ‘দিছিতো চড় কষাইয়া!’
সবাই আৎকে ওঠলো ৷ জনার্দনদা দাবি করলেন ঘরের ভিতর একা পেয়ে একজন আধিকারিককে চড়িয়ে দিয়েছেন ৷ কেউ বিশ্বাস করল ৷ কেউ করল না ৷ কিন্তু দিন কয়েক পর জনার্দনদা দপ্তর থেকে একটি নোটিস এল ৷ কারণ দর্শানোর নোটিস ৷ তাঁর অভব্য আচরণের বিবরণ বিবরণ ৷ সাথে প্রশ্ন, ‘কেন তাঁকে পাগল বলে বিবেচনা করা হবে না?’
উত্তরে জনার্দনদা লিখলেন, ‘আমি যে-কোনো বোর্ডের সামনে বসতে রাজি ৷ কিন্তু একটি শর্ত আছে ৷ আমি বোর্ডের সদস্যদের তিনটি করে প্রশ্ন করব ৷ চিকিৎসাশাস্ত্রের উপর ৷
কেউ অপদস্থ হওয়ার ভয়ে বোর্ডের সদস্য হতে চাইল না ৷ তিনি বহাল তবিয়তে স্থানীয় জনগণের সেবা করতে থাকলেন ৷ সাথে প্রাইভেট প্র্যাকটিস ৷ স্থানীয় নেতারাও প্রথম প্রথম তাঁর উপর খুশি ছিলেন ৷ প্রায়ই গ্রাম-প্রধান চিরকুট লিখে পাঠাতেন, ‘ডাক্তারবাবু, রোগীটি আমার বিশেষ পরিচিত ৷ চিটে রাখিয়া চিকিৎসার ব্যবস্থা করিবেন ৷
জনার্দনদা দু`একদিন প্রধানের অনুরোধ রক্ষা করলেন ৷ চিটে অর্থাৎ সীটে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন ৷ পরের বার অনুরোধ এলে প্রধানের নাম নিয়ে রোগীকে বললেন, ‘আপনাদের প্রধানের মত মানুষ হয় না ৷ হাসপাতাল সাপ্লাইয়ের ঔষধে কি রোগ সারে? এই সেদিন পরেইশ্যার জন্য সব ঔষধ কিনে দিলেন ৷

এইটুকুই যথেষ্ট ৷ প্রধানের কাছ থেকে চিরকুট আসা বন্ধ হয়ে গেল ৷ কিছুদিন পর জনার্দনদা বদলি হলেন ৷ মফঃস্বলের একটি মহকুমা সদর হাসপাতালে ৷ তিনি তখন ইন-চার্জ ৷ হাসপাতালে একটিই অ্যাম্বুলেন্স ৷ দু`জন ড্রাইভার ৷ মাঝে মাঝে রোগী রেফার হয়ে জেলা-সদরের হাসপাতালে যায় ৷ কখনো আগরতলায় জি বি হাসপাতালে ৷ একজন ড্রাইভার ছিল কিছুটা ম্যালিঙ্গার ৷ রাত্রিতে ডিউটি শোনালে মুখ ব্যাজার করত ৷ একদিন রাত্রিতে সে বলল তার পায়ে ব্যথা ৷ জনার্দনদা তার পায়ের এক্স রে করালেন ৷ তারপর এক্স রে প্ল্যাট পাল্টে দিলেন ৷ দেখা গেল ড্রাইভারের পায়ে  ফ্র্যাক্চার ৷ সুতরাং তার পায়ে প্লাস্টার পরল ৷ তিনমাস ধরে তার চিকিৎসা চললো ৷ ততদিনে ড্রাইভারের অবস্থা কাঁদো-কাঁদো ৷ সরকারী গাড়ির ড্রাইভারদের কাছে গাড়ি চললেই পায়ে-লক্ষ্মী ৷ অনেক কষ্টে সে আবার গাড়ি চালানোর অধিকার ফিরে পেয়েছিল ৷

রাত্রিতে পুলিশরা নেশাগ্রস্থ লোকদের ধরে আনে ৷ হাসপাতালে নিয়ে যায় মেডিকেল পরীক্ষা করাতে ৷ অনেক সময় রক্ষীরাও অল্প-বিস্তর খেয়ে থাকে ৷ ডাক্তারবাবু সাধারণত নেশাগ্রস্থ লোকটিকে তাঁর সামনে হাঁটতে বলেন ৷ একবার-তো হাঁটতে বলায়, এক মদোতি কমরের দড়ি নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল ৷ রাত্রিতে জনার্দনদার ডিউটি থাকলে স্থানীয় থানার দারোগাবাবুরা ধৃত মদোতিকে হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য পাঠাতেন না ৷ পরদিন পাঠালে ঠিক লিখে দিতেন ৷ একদিন রাত্রিতে এক দারোগাবাবু নাছোড়বান্দা ৷ রাত্রিতেই মেডিকেল পরীক্ষা করাবেন ৷ জনার্দনদা লিখে দিলেন, ‘ধৃত ব্যক্তি মদ খেলেও, সুস্থ ৷ নিজের উপর নজর রাখতে পারবে ৷ তবে তাকে যে দারোগাবাবু নিয়ে এসেছেন তিনি নেশাগ্রস্থ ৷ নিজের উপর তাঁর কর্তৃত্ব নেই ৷

দারোগাবাবুতো সেই রিপোর্ট ভালো করে পড়ে দেখেন নি ৷ সেই রিপোর্ট আদালতে দাখিল করে দিলেন ৷ আদালতে দারোগাবাবু কি রকম নাকাল হয়েছিলেন, তা সহজেই অনুমেয় ৷ এরপর জনার্দনদা বদলি হয়ে এলেন আগরতলায় ৷ একদিন একদল লোক একটি ছোট ছেলেকে নিয়ে এল ৷ ছেলেটি ফিট হয়ে গেছে ৷ বিরাট ব্যবসায়ী পরিবার ৷ এসেই হই হই শুরু করল, ‘ডাক্তারবাবু বাঁচান ৷ একদম সেক্স নাই ৷
জনার্দনদা দ্রুত তিনটি কাগজে ব্যবস্থাপত্র লিখলেন ৷ বললেন, ‘এই ঔষধগুলো এখুনি চাই ৷ আপনারা তিনটে গ্রুপে বেরিয়ে যান ৷
ভিড় দ্রুত ফাঁকা হয়ে যায় ৷ জনার্দনদা বাচ্চাটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন ৷ তার সেন্স ফিরে আসে ৷ ঘণ্টা খানেক পর তিনটি দলই ফিরে আসে ৷ তারা কেউই ঔষধ পায়নি ৷

পাবে কি করে? ওই নামেতো কোনো ঔষধই নেই ৷
পুনশ্চঃ, কিছু কিছু শিশুরোগীর অভিবাবকরা ন্যাগিং টাইপের হন ৷ এমনি এক অভিবাবক বাচ্চাকে জনার্দনদার কাছে দেখিয়েছেন ৷ বাচ্চা অনেকটা সুস্থও হয়েছে ৷ আরো হচ্ছে ৷ কিন্তু ভদ্রলোক খুশি নন অগ্রগতিতে ৷ তিনি এসে জনার্দনদার কাছে ঘেনর ঘেনর শুর করলেন ৷ জনার্দনদা নতুন একটি ঔষধ দিলেন ৷ ভদ্রলোককে বললেন, ‘আপনার ফোন নাম্বারটি দেবেন? আমি পরে ফোন করে জেনে নেব, রোগী কেমন আছে?’
ভদ্রলোকের আবার ল্যান্ড লাইন ৷ তিনি খুশিমনে নাম্বার দিলেন ৷ জনার্দনদা ভদ্রলোককে প্রথম ফোন করলেন রাত্রি এগরোটা নাগাদ, ‘আপনার বাচ্চা এখন কেমন? অসুখ কমছে নি?’
-   হ্যা ডাক্তারবাবু এখন বেশ ভালো ৷
জনার্দনদা প্রোস্টেটে ভোগেন ৷ রাত্রি একটার দিকে একবার ঘুম থেকে উঠেছেন ৷ টয়লেট থেকে এসে ফোন করলেন, ‘আমি ডাক্তারবাবু কইতাছি ৷ আপনার বাচ্চা এখন কেমন? অসুখ কমছে নি?’
-   হ্যা ডাক্তারবাবু, এখন অনেকটা কম ৷ ঔষধটা ধরেছে ৷
তিনটের পর আবার ভদ্রলোককে ফোন করলেন, ‘আমি ডাক্তারবাবু কইতাছি ৷ রোগীর এমন অবস্থা নিয়া ঘুমানো যায় না ৷ খুবই দুশ্চিন্তায় আছি ৷ আপনার বাচ্চা এখন কেমন? অসুখ কমছে নি?’

-   কমছে, কমছে, কমছে ৷৷

Sunday, 20 November 2016

ব মাতঙ্গ গন্ধ.....



আচ্ছা আপলোগ বোলতা-কো ক্যায়া বোলতে হ্যাঁ?’
-   বাঁতাইয়ে না ৷
-   নেহি বাঁতায়েঙ্গে না! লেকিন ম্যারে জেইসে কুচ নর্থ ডিসট্রিক্ট কা লোগ বোলতা কো, বোলতাই বোলতে হ্যাঁ ৷ কভি কভি কহি লোগ বোলতা-কো ভীমরুলভি পুকারতা হ্যাঁ ৷ লেকিন বোলতা বল্লা পোকা সে আলগ হ্যাঁ ৷ বল্লার ডিম সে হামলোগ মছলি পাকাড়তা হুঁ ৷
এতদিন আমি ভাবতাম তারাপদ রায়ের এই হিন্দি বুঝি আমাদের মতো বাঙালদের প্যাটেন্ট নেওয়া ৷ কিন্তু দু`দিন আগে আমার মিথ ভেঙ্গে গেছে ৷ সৌজন্যে বদন কিতাবের এক মিতা ৷ হিন্দিভাষী লোকেরাও অল্প-বিস্তর আমার মত হিন্দি বলে ৷ গল্পটি হুবহু তুলে দিচ্ছি: 
আমাদের হিন্দি টিচার ছিলেন একজন ৷ তিনি বিহারী ৷ স্যারের ইংরেজি উচ্চারণগুলি একটু কেমন জানি ৷ হিন্দি হিন্দি ভাব ৷ আমরা তখন নাইনে পড়ি৷ স্যার আমাদের গল্প শোনাতেন ৷ একদিনের গল্প: ‘সুনো বাচ্চো ৷ এক জঙ্গল মে এক ফাক্স ঔর এক সারস থে ৷
 এক ছাত্র বলল - স্যার ফাক্স ক্যায়া হ্যায় ?
 স্যার---- ফাক্স ও জো লোমরী হ্যায় না ৷
 ছাত্র ---- স্যারজী, হাম নে সুনা হামারি স্কুল কে ইধার ওধার বহুত লোমরী রাত হোনে পর ঘুমতে রহতে হ্যায়?
স্যার --- আরে হাঁ আ আ আ... ইধার বহুত সারে জয়কাল হ্যায় ৷ হামলোগ ঢের রাত পে তো কোয়ার্টার সে কভি নেহী নিকলতে ৷
 ছাত্রছাত্রী সমস্বরে ---- জয়কাল !!!!! ও ক্যা হ্যায় ?
স্যার ---- জয়কাল ল ল ল .... !!! ও ফাক্স সে থোড়া বঢ়া হোতা হ্যায় ৷ বহুত সারে জয়কাল ৷ হমলোগ করিডোর সে টর্চ লেকে দেখতে রহতে থে ৷ এক সে এক বঢ়া জয়কাল ৷ জয়কাল কা বচ্চে ভি থে ৷
 ছাত্র --- লেকিন জয়কাল হ্যাঁ ক্যায়া? কোই ভূত?
 আরেক ছাত্র --- কোই "কাল" পিকচার যেয়সা সিচুয়েশন তো নেহী ? ও অজয় দেবগন কে তরহা কোই man cum tiger?
স্যার --- নেহী ৷ ও জয়কাল ....৷ লোমরী সে থোড়া বঢ়া ৷ পুছ ভি হ্যায় !!!
এক দুষ্ট ছাত্র --- স্যার, ও Jackal হ্যায় ক্যা?
 স্যার --- হাঁ ....৷ ওহী তো ম্যা কবি সে বোল রাহা হুঁ ৷ ও জয়কাল ৷ পুরে দিন নিকলতে নেহী ৷ লেকিন রাত কো জয়কাল ই জয়কাল ৷
 সব ছাত্রছাত্রী সমস্বরে --- ও ও ও ও ও ও ফ্ !!!!!
এ-তো গেল শহরের ইংলিশ মিডিয়ম স্কুলের গল্প ৷ এবার উত্তর জেলার এক সরকারী হাইস্কুলের গল্প ৷ যৌথ স্কুল ৷ অবস্থান উপজাতি স্বশাসিত জেলাপরিষদ সংলগ্ন এলাকায় ৷ বাঙ্গালী এবং জনজাতি উভয় অংশের ছেলে-মেয়েরা পড়ে ৷ বাঙ্গালীদের মধ্যে ডার্লং, হালাম, রিয়াং প্রভৃতি জনজাতির ছেলে-মেয়েরা ৷ তখন শারীর শিক্ষা মাধ্যমিকের অন্তর্গত ৷ স্কুলে যোগাসন এবং যোগাসনের উপকারিতা শেখানো হত ৷ খাতার এক পাতায় আসনের ভঙ্গীর ছবি আঁকতে হত ৷ অন্য পাতায় আসনটি করার পদ্ধতি, সময়, উপকারিতা ইত্যাদি লিখতে হত ৷ হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষার আগের কথা ৷ সব ছাত্র-ছাত্রী একে একে খাতা জমা দিচ্ছে ৷ সবার শেষে এল কুম্ভরাম রিয়াং ৷ কুম্ভ পড়াশুনায় খুব একটা ভালো নয় ৷ নিজেই নিজেকে ‘নরম শয়তান বলে জাহির করে ৷ সবাই দেখল কুম্ভর আঁকা আসনের ছবি সবচাইতে সুন্দর হয়েছে ৷ অবিকল বইয়ের ছবির মত ৷ তখন জেরক্সের এত রমরমা হয় নি ৷ হঠাৎ কিছু একটা সন্দেহ হওয়ায় স্যার খাতার পাতার গন্ধ নিলেন ৷ তিনি কেরোসিনের গন্ধ পেলেন ৷ গ্রাম-দেশে সাদা কাগজ কেরোসিন তেলে চুবিয়ে এবং তারপর শুকিয়ে ট্রেসিং পেপার হিসাবে ব্যবহার করা হয় ৷ কুম্ভ সম্ভবত তাই করেছিল ৷ কিন্তু সে অস্বীকার করল ৷ স্যার সব ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে একে একে গন্ধ বিচার করালেন ৷ সবাই বলল কেরোসিনের গন্ধ পাচ্ছে ৷ সবশেষে এল কুম্ভের টার্ন ৷ সে গন্ধ শুকার পর গম্ভীরভাবে বলল: ‘ব মাতঙ্গ গন্ধ..... ব কেরোসিন গন্ধ....ব বুছতুছ পায় না ৷

আমিও এর অর্থ অদ্যাবধি খুঁজে পাই নি ৷

Thursday, 10 November 2016

SURROGATE ACCOUNTS



It was Tuesday, the 8th November, 2016. The opera hall was overflowing with crowd. Meghnadbabu was happy that he could manage a seat. Towards the end of the program, two pretty looking artists, one boy and the girl were performing dance in glittering costume. The young man was in pinkish attire. The girl had dressed herself with a slightly yellowish sharee. Both the dresses were studded with beautiful embroidery design with zari and glittering like peacock tail feathers under the dazzling light of the auditorium in the backdrop of Tagore song:

“Ami chanchal hey
Ami sudurer piyashi
Din chole jai ami anmone tari asha cheye thaki batayane
Ogo prane mone ami je tahar paros pabar prayashi
Ogo sudur bipul sudur tumi je bajao byakul basori
Mor dana nai achi ak thai se katha je jai pashori
Ami unmona hey......
......
I am restless
I am thirsty for the expanse
Days go by; I sit attentively by my oriel waiting for her
I am fully hers: I am the desire of her caress
O vastness, o huge expanse, you play your distraught flute
I have no wings, no two abodes, I overlook all
I am listless...”

One middle-aged gentleman was sharing the seat, next to Meghnadbabu from the very beginning. He is a wise man which one can easily make out from his appearance. Suddenly, the gentleman said in a deep anguish, ‘Well said! You have no wings. Still, you can fly. But, from tomorrow culling will begin and you all will die.’
He couldn’t resist himself from putting the gentleman a question, ‘Whom did you mean?’
-   Why? I am telling about the actor and the actress on the stage. They are currency notes. They can fly without wings. Look at their dresses.’

Meghnadbabu cast a glance at their dresses. Then, to his utter surprise he found that the boy’s attire was similar to the Indian one thousand rupees currency note. Similarly, the girl’s sharee resembled the Indian five hundred rupees currency note. He became excited and said to the gentleman, ‘But, you were telling something else! Culling begins tomorrow! Everybody will die.’
-   Certainly they will die! They are not human beings! Rather, they are currency notes similar to birds. Bird flu has started. Some find it similar to Ranikhet or Newcastle disease. Their death sentence has been announced. Today from the midnight they will become obsolete. They will be hunted and killed. This culling will strengthen our economy.
The function came to end in the meantime. They continued chatting. Meghnadbabu said, ‘They are currency notes! Not human beings! Resemble birds! What do you try to mean?’
-   Why? Haven’t you witnessed currency notes to fly? They can fly without wings and even move without limbs. Where are you? Let me introduce you with someone.
The gentleman called a lady from behind, ‘Satyabati, please come here.’
A dusky beauty turned towards them with a sweet fresh-air fragrance. Meghnadbabu could easily identify Satyabati alias Dasheyi alias Basabi of the epic Mahabharata era. Her name is Dasheyi because she is the daughter of Dasraj. Again, she is the daughter of Chedi king Uparichar and so her name is Basabi. She has many other names Gandhakali, Kali, Matshyagandha, Padmagandhya, Satya, Jojangandha and so on.
Meghnadbabu was completely at loss. Seeing his condition, the gentleman said, ‘Do you know why I have introduced with Satyabati?’
-   Why?
-   Her mother is Apsara Adrika. She is actually a surrogate mother. In surrogacy a woman agrees to give birth a child from artificial insemination against an already fertilized egg. The host woman surrenders parental rights, often in exchange of money. In sayabati’s case, the royal couple of Chedi donated the fertilized egg. Can you guess why I have narrated the story?

Then, without waiting for Meghnadbabu’s response he said, ‘From tomorrow onwards, owners of black-money start searching surrogate accounts holders. They will try to keep their money in these accounts till the gestation period is over. Black money will become legal.’
Meghnadbabu could realize that it’s a dream. But he fails to distinguish if it is a nightmare or sweet one.