Monday, 25 September 2017

বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য



এখন শরৎ কাল ৷ প্রকৃতি তার নিজ সাজে সেজেছে ৷ শারদোৎসব সবার জন্য ৷ একত্রে আনন্দ-উৎসব করার ক্ষণ ৷ দেবী দুর্গা মাতৃশক্তির প্রতীক ৷ তিনি লোকায়ত মূর্তি-রূপে আমাদের কাছে পূজ্য ৷ তাঁর এই রূপ অতীন্ত্রিয় সৌন্দর্য্যের ৷ পাশাপাশি তাঁর রয়েছ একটি সংহারমূর্তি ৷ তিনি সপরিবারে আসেন ৷ শত্রু অসুরকেও সঙ্গে নিয়ে আসেন ৷ সাথে বিচিত্র সমাবেশ ৷ সাপ-ময়ূর ৷ ইঁদুর-পেঁচা ৷ মোষ-সিংহ ৷ খাদ্য-খাদকের সহাবস্থান ৷ বৈপরীত্যের মধ্যে ঐক্য ৷ অসুরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি দেবতাদের রক্ষাকর্তা ৷ সব শুভ শক্তির ঐক্যবদ্ধ বহিঃপ্রকাশ ৷ এই সম্মিলন ছাড়া অশুভ অসুর দমন সম্ভব নয় ৷ এই সত্যই মূর্ত হয়, মাতৃ-রূপিণী দেবী মূর্তিতে ৷আমরা আজ দুরূহ সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছি ৷ জীবনানন্দের ভাষায়:

‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুনার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া ৷
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি,
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয় ৷’

ব্যক্তি মানুষের মধ্যে এবং সমাজের মধ্যে অসুররূপী পশুত্ব আজও বিরাজমান ৷ এর বিরুদ্ধেই আমরা লড়ছি ৷ শুভ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, মা আমাদের অনুপ্রেরণা যোগান ৷ এই সংগ্রামে আপনারাও পাশে থাকবেন এই কামনা করছি

অরিন্দম নাথ

Tuesday, 22 August 2017

আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর....


গত ২৫ শে শ্রাবণ, ১৪২৪ বাং (১১ই আগস্ট, ২০১৭ ইং) তারিখে আমাদের পরম পূজনীয় শ্রীযুক্ত দেবেন্দ্রমোহন নাথ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তাঁর জন্ম অবিভক্ত ভারতবর্ষের পূর্ব-বঙ্গের সিলেট জিলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম হোঁরগাঁওতে ২৬ শে চৈত্র, ১৪২৪ বাং (৯ই আগস্ট, ১৯২৭ ইং) তারিখে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে পিতা হরিমোহন নাথ মাতা শান্তিময়ী নাথ৷ পরিবারের জ্যেষ্ঠ ছেলে দেবেন্দ্রমোহন নাথ, ওরফে দেবু এরপর তিন বোন জন্মদিনটি ছিল খুবই স্মরণীয় কারণ, সেদিন ভূমিকম্পে মেদিনী কেঁপে উঠেছিল অমারাত্রির শেষে সূর্য ওঠে ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনায় দেবু ভীষণ তুখোড় প্রতি-বছর জলপানি বা বৃত্তি পেতেন হোঁরগাঁওতে প্রাথমিক শিক্ষা এরপর ভর্তি হন হবিগঞ্জ হাই স্কুলে৷ থাকতেন স্কুলের বোর্ডিং- মেট্রিক পরীক্ষা দেন হবিগঞ্জের প্রখ্যাত উকিল হরমোহন নাথের বাড়িতে থেকে স্কুলের শিক্ষকদের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্রটি অংক এবং সংস্কৃতে লেটারসহ, স্টার মার্কস নিয়ে মেট্রিক পাশ করেন

এরপর পাড়ি জমান কলকাতায় প্রথমে ভর্তি হন প্রেসিডেন্সী কলেজে কলা বিভাগে বিজ্ঞান পড়ার জন্য প্রেসিডেন্সী কলেজে ছেড়ে দেন এবার ভর্তি হন বিদ্যাসাগর কলেজে৷ বন্ধু-প্রীতির জন্য এক বছর পরীক্ষায় ড্রপ দেন সেখান থেকেই বিজ্ঞানে স্নাতক হবিগঞ্জ হাই স্কুলের সাথেই ছিল প্রখ্যাত গণ-সংগীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের বাড়ি জমিদার বাড়ির ছেলে বয়সে দেবুর চেয়ে বড় ছোটভাই, স্কুলে দেবুর সহপাঠী৷ হেমাঙ্গ বিশ্বাস তখনই সাথীদের নিয়ে স্বদেশী আন্দোলন যুক্ত হয়েছিলেন গান বাঁধতেন৷ এর রেশ দেবুর পরবর্তী জীবনেও রয়ে যায় কলকাতায় এসে আই পি টি - প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখেন৷ সাথে ছিলেন ছিলেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সমর্থক

প্রথম চাকুরী পঞ্চাশের দশকের প্রথমদিকে কলকাতায় সরকারী পরিসংখ্যান দপ্তরে তারপর কলকাতার টি-বোর্ডে উচ্চপদে চাকুরীতে যোগ দেন সেখানে তাঁর সহকর্মী ছিলেন প্রখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী প্রসাদ সেন বিয়ে করেন ১৯৫৮ সালের ৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে স্ত্রী শ্রীমতী নীলিমা নাথ ওরফে টুকু শিলচরের প্রখ্যাত সমাজ-সংস্কারক সোমনাথ পণ্ডিতের নাতনি এবং প্রধান-শিক্ষক পাণ্ডবচন্দ্র নাথের কন্যা বয়সে তাঁর চেয়ে বার-তেরো বছরের ছোট অত্যন্ত সুন্দরী এবং মৃদুভাষী টুকু, হয়ে উঠেছিলেন তাঁর যোগ্য সহধর্মিণী সুখ-দুঃখের সাথী

বিয়ের পর ভাড়া থাকতেন প্রখ্যাত উকিল আদিনাথ গাঙ্গুলিদের বাড়িতে সেখানেই ১৯৫৯-এর জুনে তাঁর বড় ছেলের জন্ম ততদিনে দেশ-বিভাগ হয়েছে স্বাধীনতার আগেই তাঁর বাবা-কাকারা জমি হস্তান্তর করে চলে এসেছিলেন ত্রিপুরার ধর্মনগরে কিন্তু জীবন-সংগ্রামে বার বার পিছিয়ে পড়ছিলেন ষাটের দশকের প্রথম দিকে টি-বোর্ডের ভালো চাকুরী ছেড়ে তিনিও চলে আসেন ত্রিপুরায় পরিবারের হাল ধরতে ১৯৬০ সালের শেষ দিকে শিক্ষকতার চাকুরী নিয়ে যোগ দেন ধর্মনগর বালিকা বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন সেই স্কুলে চাকুরী করেন তাঁর অসংখ্য গুণমুগ্ধ ছাত্রীদের কাছে তিনি দেবেন স্যার হিসাবে আজীবন পরিচিত ছিলেন অবসরের আগে, শেষের তিন-চার বছর পদোন্নতি নিয়ে সহকারী প্রধান-শিক্ষক হিসাবে চাকুরী করেন ধর্মনগরের গঙ্গানগর এবং পদ্মপুর উচ্চ-মাধ্যমিক স্কুলে

ধুতি-পাঞ্জাবী, চটি এবং ছাতি এই ছিল তাঁর পোশাক উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে,ওই যে তিনি, যে বাহির পথে’, গানটি কবিগুরু যেন তাঁকে দেখেই রচনা করেছিলেন মাছ-ভাত খেতে ভালোবাসতেন একসময় পান খেতেন ফ্যারেনজাইটিসে ভুগে ছেড়ে দেন প্রতিদিন সকালে যোগ-ব্যায়াম প্রাতঃভ্রমণ করতেন বিজ্ঞানের শিক্ষক হয়েও ইংরেজি, বাংলা সংস্কৃত সাহিত্যের উপর তাঁর ছিল অগাধ দখল রবীন্দ্র সংগীত শুনতে ভালোবাসতেন জর্জ বিশ্বাস ছিলেন তাঁর প্রিয় শিল্পী বিশেষত:, শিল্পীর কণ্ঠেক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু’, গানটি ছিল তাঁর খুবই প্রিয়

তাঁর অনুকরণীয় জীবন-শৈলী আত্মীয়-পরিজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব এবং ছাত্র-ছাত্রী সবার মনেই প্রভাব ফেলত প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষে তাদেরকে সৎ-নাগরিক হয়ে ওঠার পথে প্রেরণা যুগিয়েছে সফল শিক্ষকের পাশাপাশি, শ্রীযুক্ত দেবেন্দ্রমোহন নাথ একজন সফল পিতাও বটে তাঁর নীতি আদর্শ এবং সংস্কৃতি-মনা মনের পরশ ছেলে-মেয়ে এবং নাতি-নাতনিদের মধ্যে পৌঁছে দেবার চেষ্টা করেছেন তিন ছেলে এবং তিন মেয়ের সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত প্রত্যেকেই আজ নিজ-নিজ পরিচিতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে

যৌবনে আই পি টি - পরশ, তাঁকে কর্মজীবনে কর্মচারী আন্দোলনে এক অগ্রণী ভূমিকা নিতে প্রেরণা যুগিয়েছে চাকুরী থেকে অবসরের পর তিনি দশ-বারো বছর বাম-পন্থী আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রেখেছিলেন সফল সংঘটক হিসাবে অবিভক্ত উত্তর জেলায় দেবেন্দ্রমোহন নাথ এখনও একটি পরিচিত নাম গত ষোল-সতের বছর যাবত তিনি নিজেকে প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে মুক্ত রেখেছিলেন

গত ১৬ই এপ্রিল, ২০১৫ ইং তিনি বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় চোট পান কলকাতার DESUN হাসপাতালে গত ২৫শে এপ্রিল, ২০১৫ ইং তাঁর অপারেশন হয় করেন ডাঃ রুদ্রজিত কাঞ্জিলাল কাকতালীয় ভাবে তাঁকে যখন অপারেশন টেবিলে তোলা হয়, সেই মুহূর্তে মেদিনী আবার কেঁপে ওঠে সেটা ছিল নেপালে বিধ্বংসী ভূমিকম্পের প্রথম দিন৷ ৬ই মে, ২০১৫ ইং তারিখে তাঁকে আগরতলার আই জি এম হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় তাঁর বড়ছেলে ডাঃ দেবাশিস নাথের চিকিৎসায় তিনি অনেকটা সুস্থ হয়ে ওঠেন তবে মাঝে-মধ্যেই আই সি ইউ-তে ভর্তি হতেন এবারে, আই জি এমের আই সি ইউ-তে ভর্তি হন ১৩ই জুলাই, ২০১৭ ইং তারিখে অত্যন্ত প্রচার-বিমুখ, রবীন্দ্রানুরাগী এই শিক্ষাবিদের মৃত্যু হয় ১১ই আগস্ট, ২০১৭ ইং তারিখে তিনি ছিলেন নিজের সময়ের চেয়ে এগিয়ে তাই তিনি মরণোত্তর দেহ দান করে গিয়েছেন তাঁর ইচ্ছানুযায়ী, ১২ই আগস্ট, ২০১৭ ইং তারিখে তাঁর দেহ, জি এম সি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে  

তাঁর জীবনের শেষ দিনটিও প্রকৃতি প্রথম দিনের মত স্মরণীয় করে রেখেছে কাকতালীয় ভাবে, সেদিন আগরতলায় অকল্পনীয় বৃষ্টি বন্যা পরিলক্ষিত হয় এই অতল জলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি চলে গেলেন কাউকে সুযোগই দিলেন না তাঁর জন্য উতলা হতে তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবে তাঁর ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি, ছাত্র-ছাত্রী এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীরা, তাঁর আদর্শকে অনুসরণ করে আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর ৷৷