Friday, 31 July 2015

বাইনারি



কিছু কিছু লোকের পর্যবেক্ষণের অদ্ভুত ক্ষমতা থাকে ৷ বলা যেতে পারে ঈশ্বরদত্ত ৷ হর্ষদা বলা যায় এই পর্যায়ের ৷ হর্ষদা যখন একাকী হেটে যান একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেকটা বেশী সময় লাগে ৷ এমন নয় যে সারমেয়দের মত দু`পা যেতেই কারো সাথে দেখা হয়ে যায় ৷ হর্ষদার বন্ধু সংখ্যা সীমিত ৷  কিন্তু দু`পা যেতেই হর্ষদার নজরে কিছু একটা আসবে ৷ তিনি দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখবেন ৷ তখন তিনি সাধারণত সংলাপ-হীন থাকেন৷ ফলে মক্কায় পৌছাতে দাদার প্রায়ই দেরী হয়ে যায় ৷
হর্ষদা অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারী ৷ অবসরের আগে সরকারী প্রচার দপ্তরে চাকুরী করতেন ৷ আমার বান্ধব ৷ দাদার কৌতুক-জ্ঞানও প্রচণ্ড ৷ একটি নমুনা দিয়ে মূল গল্পে যাব ৷ মাঝে-মধ্যে দাদার সাথে সময় কাটানোর সুযোগ ঘটে ৷ এমনই এক সান্ধ্য আড্ডার আসরের ঘটনা ৷ তখনও ত্রিপুরাতে জেনারেটর অপারেটরেরা মন্ত্রীর কাছে লোড-শেডিং প্রদানের জন্য ডেপুটেশন দেয় নি ৷ রোজ ঘণ্টা মিনিট ধরে শেডিং হত ৷  রাত্রি অনুমানিক আটটা ৷ দাদার বসা থেকে ফোন ৷ অনেকক্ষণ ধরে লোড-শেডিং চলছে, কখন কারেন্ট আসবে, ইত্যাদি ৷ দাদা ইলেকট্রিক অফিসে ফোন করলেন ৷ নিজের পরিচয় না দিয়েই ইলেকট্রিক কল-অফিসের কর্তব্যরত কর্মীর পরিচয় নিলেন ৷ যেন তিনি নিজেই দপ্তরের কর্মী ৷ এবার তিনি জানতে চাইলেন তাঁর বাড়ির এলাকায় কারেন্ট কখন আসবে৷ অপর পক্ষের লোকটি হয়তো ডিউটি শেষে মৌতাতের আয়োজন করছিল৷ সে বলল, যখন থেকে গিয়েছে তার থেকে দেড় ঘণ্টা পর ৷ এই উত্তরে হর্ষদা পুলকিত হলেন না ৷ কিন্তু অপর পাশের লোকটি কিছুতেই নির্দিষ্ট সময় বলল না ৷ শেষমেশ হর্ষদা লোকটিকে বললেন, ‘আপনার সময় ভালো যার নায় ৷ পরশু বেলা দেড়টা পর্যন্ত আপনে একটু সাবধানে চলিয়ইন যেন ৷ যে-কোন কিছু ঘটতে পারে ৷
বলেই দাদা ফোন রেখে দিলেন ৷ আমরা যারা ঘরে ছিলাম, দাদার কাছে তাঁর বিচিত্র আচরণের ব্যাখ্যা চাইলাম ৷ দাদা বললেন, ‘লোকটিকেও শান্তিতে থাকতে দেব কেন ? এই দু`দিন তার মদের পেগের সংখ্যার একটু হলেও তারতম্য ঘটবে ৷
এরপর আর দাদার কাছে কোন ব্যাখ্যা চাইবার তাগাদা বোধ করলাম না৷ বাজারের শাক-সবজির দামের প্রসঙ্গ এসে গেল ৷ দাদা তাঁর সেদিন সকালের বাজার করার অভিজ্ঞতা শুনালেন ৷ তিনি লেক চৌমুহনী বাজারে বাজার করেন ৷ এই বাজারে জনজাতির লোকেরা প্রচুর শাক-সবজি নিয়ে আসে ৷ একটি উপজাতি ছেলে ৷ বয়স ত্রিশের কোঠায় ৷ একটি খাঁচায় করে বেশ কয়েকটি লাউ নিয়ে এসেছে ৷ সবগুলি লাউই সযত্নে ফলানো ৷ ক্রেতা একজন শহুরে বাঙ্গালী ৷ বিক্রেতার চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোট ৷ তাদের দরদাম এগিয়ে চলে ৷ তবে অমসৃণ গতিতে ৷ ছেলেটির হাতে একটি লাউ ৷
-     এর দাম কত ?
-     চল্লিশ টাকা ৷
-     মামা, এটা ঠিক নয় ৷ ত্রিশ টাকা নাও ৷
-     আমি কখন তর মামা হইল ?
-     আরে দাদা রাগ করো না ৷ একটু দাম কমাও ৷
-     দেখ, আমার কোনও ভাই নাই ৷ লাউ গাছকেই বাচ্চার মত ছোট থেকে বড় করেছি ৷ এখন ফল দিচ্ছে ৷ আমি জানি ফসল ফলাতে কত কষ্ট ৷ লাউ নিতে চাইলে চল্লিশ টাকা করে দিতে হবে ৷ কমও নয় ৷ বেশীও নয় ৷
ক্রেতা নীরবে স্থান পরিত্যাগ করে ৷ দাদার গল্প শুনে একটি ধাঁধা মনে আসে, ‘কাকে দু`বার ডাকলে তাঁর ভাই দৌড়ে আসে ?’
      উত্তর অবশ্যই ‘মা ৷ ‘মা-র ভাই ‘মামা-র সাথে ভাগনের সম্পর্ক সব সময়ই আমার কাছে বিচিত্র ঠেকে ৷ শ্রীকৃষ্ণের সাথে তাঁর মামা কংসের সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে ৷ আবার দুর্যোধনের সাথে শকুনি মামার সম্পর্ক ছিল গলায় গলায় ৷ অধিকাংশ হিন্দি সিনেমায় মামাকে কুচক্রী হিসাবে দেখানো হয় ৷ অপরদিকে অন্নপ্রাশনের সময় ভাগনে-ভাগ্নিরা প্রথম মামার হাত থেকেই খায় ৷ কোন কিছুর অতিরিক্ত ব্যবহারই ভালো নয় ৷ আশির দাঙ্গার বছরে আমি আগরতলায় পড়তে আসি ৷ আমি ধর্মনগরের ছেলে ৷ আমাদের অঞ্চলে দাঙ্গার প্রভাব ছিল খুব সীমিত ৷ আমি আগরতলায় এসে প্রত্যক্ষ করলাম বাঙ্গালীদের সাথে জনজাতির সম্পর্ক উত্তর জিলার মত আত্মিক নয় ৷ এখানে বাঙ্গালীদের একটি বড় অংশ উপজাতি লোকদের ‘মামা বলে সম্বোধন করে ৷ এই সম্পর্ক যান্ত্রিক ৷ অধিকাংশ উপজাতি সম্প্রদায়ের লোকেরাই এটা পছন্দ করে না৷ আমি নিশ্চিত হর্ষদার উল্লেখিত ছেলেটি, প্রথমেই ‘মামা সম্বোধন না করে ‘দাদা কিংবা ‘ভাই বলে ডাকলে কিছুটা ছাড় পেত ৷
      আগরতলায় এসে একটি ভালো সম্পর্কও প্রত্যক্ষ করেছি ৷ উপজাতি মেয়েদের সাথে আগরতলার বাঙ্গালী ঘরের মা-মাসিদের ‘বইনারি ৷ এই সম্পর্ক ছিল আত্মিক ৷ যেসব জনজাতি মহিলারা জিনিস বিক্রি করতে গ্রাম থেকে আগরতলায় আসত, কোন কারণে আটকা পড়ে গেলে বাঙ্গালী ‘বইনারি-দের ঘরে আশ্রয় নিতেন ৷ কালক্রমে এই সম্পর্কের বিলোপ ঘটেছে ৷
      তবে এখন এসেছে ‘বাইনারি ৷ এই সম্পর্ক আরও ব্যাপক ৷ ফেস-বুকের মিতালি ৷ ফেসবুক কিংবা ইন্টারনেট চলে বাইনারি (Binary) সংখ্যা অর্থাৎ শূন্য ও একের মাধ্যমে ৷ এই সম্পর্ক জাতি-উপজাতি, নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র, দেশ-বিদেশ, কিছুরই ধার ধারে না ৷ এই সম্পর্ক তাই বিশ্বজনীন ৷



Wednesday, 29 July 2015

অজান্তে নাটকের কুশীলব





      গল্পটি আমার এক টি.এস.আর. সহকর্মীর মুখে শুনা ৷ কমান্ড্যান্ট পদে যোগ দেবার আগে তিনি সি.আর.পি.এফে কাজ করতেন ৷ সেখানেও  কমান্ড্যান্ট ছিলেন ৷ অবসরের আগে ৷ সাব-ইন্সপেক্টর হিসাবে যোগ দিয়ে ধাপে ধাপে তিনি কমান্ড্যান্ট পদে পৌঁছান ৷ তাই অভিজ্ঞতার ঝাঁপি বলতে গেলে পরিপূর্ণ ৷ জরুরি অবস্থার আগের ঘটনা৷ মে ১৯৭৪ সাল ৷ দেশে তখন লাগাতর রেল ধর্মঘট চলছে ৷ আমার সহকর্মী তখন সবে ট্রেনিং শেষে প্রত্যক্ষ কাজে যোগ দিয়েছেন ৷  সি.আর.পি.এফের একটি দলকে পাঠানো হল ধানবাদ রেল স্টেশনে ৷ বেশ কয়েকদিন যাবত ধর্মঘটের সমর্থক রেল-কর্মীরা রেল লাইনে বসে আছে ৷ ধর্না দিচ্ছে ৷ ফলে রেল চলাচল বন্ধ ৷ স্টেশনে আটকা পড়ে আছে হাজার হাজার যাত্রী, নারী-পুরুষ৷    
সি.আর.পি.এফের দলের নেতৃত্বে একজন সহকারী কমান্ড্যান্ট ৷ সব মিলিয়ে এক কোম্পানি বা শ-খানেক লোকবল৷ তারা সেদিন সকালেই এরোপ্লেনে পৌঁছেছেন জামশেদপুরে ৷ সেখান থেকে গাড়িতে ধানবাদে ৷ দলনেতা স্টেশনে পৌঁছে জনসমুদ্র দেখে ঘাবড়ে গেলেন ৷ তাঁর অবস্থা হল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শুরুতে অর্জুনের মত ৷ তাঁকে এই অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে এল  সাব-ইন্সপেক্টর ব্যানার্জ্জী ৷ সে আবার আমার সহকর্মীর সাথেই সি.আর.পি.এফে যোগ দিয়েছে ৷ এধরণের আইন-শৃঙ্খলা জনিত সমস্যা মোকাবিলার তার কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না ৷ তথাপি ব্যানার্জ্জী যখন তার পরিকল্পনা দলনেতার কাছে ব্যক্ত করল, তিনি সম্মতি না জানিয়ে পারলেন না ৷ তাছাড়া তাঁর কাছে অন্য কোনও বিকল্পও ছিল না ৷
ব্যানার্জ্জীর পরিকল্পনা অনুযায়ী সি.আর.পি.এফের পুরো দল ধানবাদ রেল স্টেশন ছেড়ে চলে গেল ৷  ইতিমধ্যে ব্যানার্জ্জী তার কাজ শুরু করে দিল৷ তাদের দল থেকে ছ`সাতজন জওয়ানকে বেঁছে নিলো৷ ব্যানার্জ্জীসহ তারা সবাই সি.আর.পি.এফের পোশাক ছেড়ে দেহাতি-পোশাক পড়ে নিলো ৷ সাথে কিছু বোঁচকা-বোঁচকি ৷ যেন তারা রেল-যাত্রী ৷ তারপর রিক্সা করে ধানবাদ রেলস্টেশনে পৌঁছে যাত্রীদের ভিড়ে মিশে গেল ৷ কিছুক্ষণ  পর  ব্যানার্জ্জীর পরিকল্পনা অনুযায়ী বাকি সি.আর.পি.এফের লোকেরা আগের জায়গাতেই গাড়ি থেকে নামল ৷ আগের চেয়ে একটু সাজো সাজো রবে ৷ লাঠি-সোটা উঁচিয়ে ৷ তাদের সাথীরা গাড়ি থেকে নামা মাত্র ব্যানার্জ্জীর নেতৃত্বে সাদা-পোশাকধারী যাত্রী-বেশী সি.আর.পি.এফের জওয়ানরা, ‘ভাগো! ভাগো! সি.আর.পি.এফ. আয়া !’, বলে রব তুলে উল্টোদিকে দৌড়াতে শুরু করে ৷ তাদের সঙ্গ দেয় শত শত জনতা ৷ আর কয়েকদিন যাবত রেল-ট্রেকের উপর ধর্ণারত ধর্মঘটী কর্মীরা ৷  আন্দোলনকারীরা বুঝতেই পারে না কিভাবে তারা অজান্তে সাব-ইন্সপেক্টর ব্যানার্জ্জী রচিত নাটকের কুশীলবে পরিণত হয়েছে ৷ স্টেশন চত্তর মুহূর্তে ফাকা হয়ে যায় ৷


মাশাল্লা !





আমার একজন বয়স্ক বন্ধু আছেন ৷ উদয়পুরের মুরশেদ মিঞা ৷ তিনি একটি ছোট দোকান চালান ৷ উদয়পুরের রমেশ স্কুল চৌমুহনীতে ৷ ছাতা,টর্চ-লাইট,গ্যাসের চুলা, ইত্যাদি মেরামতির ৷ আমার বন্ধুর পুঁথিগত পড়াশুনা কম৷ কিন্তু কারিগর হিসাবে খুবই সুদক্ষ ৷ স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় এমন সামগ্রী দিয়ে তিনি রকেট থেকে শুরু করে পেঙ্গুইন অনায়াসে গড়তে পারেন ৷ আর যে-কোন ধরনের গৃহ সামগ্রীর নকল বানানো তাঁর কাছে ছেলেখেলা ৷ তিনি অনায়াসে কোন বনেদী স্কুলের এস.ইউ.পি.ডবলু. শিক্ষক হতে পারতেন ৷ আমার সাথে তাঁর পরিচয় উদয়পুরে আমার দ্বিতীয় ইনিংসের সময়৷ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসাবে যোগ দিয়ে ৷ সতের বছর আগে ৷ দেওয়ালি মেলা, স্বাধীনতা দিবস, প্রজাতন্ত্র দিবস, ইত্যাদি উৎসবের দিনগুলিতে নিজের উদ্যোগে সুদৃশ্য ট্যাবলো মানিয়ে দর্শকদের, বিশেষ করে বাচ্চাদের মনোরঞ্জন করতেন ৷ সাথে থাকত তাঁর অমলিন হাসি ৷ তাঁর দারিদ্র তাঁর কাজে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করত না ৷ এই পরিচয়ের পর থেকে তিনি আমার সরকারী আবাসনে আসতেন ৷ নিজের বানানো খেলনা আমার ছেলেকে উপহার দিতেন ৷ পয়সা সাধলেও নিতেন না ৷
তারপর আমি আগরতলায় বদলি হয়ে এলাম ৷ তিনিও মাঝে মাঝে এসে আমার সাথে দেখা করতেন ৷ আমার ছেলের খবর নিতেন ৷ পরিবারের লোকদের স্বাস্থ্যের খবর নিতেন ৷ আল্লার কাছে সবার দীর্ঘায়ু কামনা করতেন৷ আমরা দুজনে মিলে চা খেতে খেতে গল্প করতাম ৷ আমাদের কথাবার্তায় ঘুরে-ফিরে আসত উদয়পুরের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের প্রসঙ্গ ৷ পুরানো ও নতুন আমলাদের কথা ৷ দেশের রাজনৈতিক প্রসঙ্গও বাদ যেতনা ৷ এই ধরনের আলোচনায় আমি মজা পাই ৷ বেশ একটা ঠুংরি-গজলের আমেজ ৷ প্রসঙ্গক্রমে আমি আরেকটি জিনিস উপভোগ করি ৷ অফিসে লাঞ্চের প্রোগ্রাম থাকলে ৷ সবাই মিলে প্লেট হাতে নিয়ে যখন কাটা-চামচ নাড়া-চড়া করে তখন সন্তুরের আওয়াজ পাই ৷ চুপ-চাপ শুনতে ইচ্ছে করে ৷
আমি আগরতলায় থাকার সময় সদ্য প্রয়াত আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আবুল ফকির জৈনুলাব্দীন আব্দুল কালাম এলেন ৷ আমার দায়িত্ব পড়ল মহারাজা বীর বিক্রম কলেজের রবীন্দ্র হলে ৷ আমি এই মহামানবকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেলাম ৷ অন্য সবার মত তাঁর সারল্য ও অনুকরণীয় জীবনযাত্রা আমাকে মুগ্ধ করল ৷
এর কিছুদিন পর আমার বন্ধু মুরশেদ মিঞা এলেন ৷ তাঁর চেহারায় একটু পরিবর্তন নজরে এল ৷ মনে হল যেন চুলের সাজে পরিবর্তন এসেছে ৷ আব্দুল কালামের হেয়ার-স্টাইলকে নকলের প্রচেষ্টা ৷ আমি বললাম, ‘রাষ্ট্রপতির সাথে কি আপনার সাথে দেখা হয়েছিল ?’
- মাশাল্লা ! আমি হেইবেডার দেখা পাইছি ৷ হেঁ-ব্যাডাতো কত বড় বিজ্ঞানী ৷ কিন্তু, আবিইত্যা ৷ কোন ছেলে-পুলা নাই ৷ তা, আইপনে কেমনে বুঝলেন আমি হেই বেডার লাগ পাইছি ?
- আপনার চুলের কাটিং থেকে ৷
- তঁয় আপনে ঠিক কথা কইছেন ৷ হেই ব্যাডার চুলের স্টাইল আমার ভালো লাগে ৷ কিন্তু তাইনে কান ঢাইক্যা রাখে কিরে ?
- হিডাতো আমি কইতা পারতাম না ৷ রবিঠাকুর, কাজী নজরুল, সাধু-ফকির সবাইতো চুল-দাড়ি বড় রাখে ৷
- মাশাল্লা !
কিন্তু আমি আমার উত্তরে খুশি হতে পারি না ৷ আব্দুল কালাম সম্পর্কে অনেক জায়গায় অনেক কিছু পড়েছি ৷ তাঁর দারিদ্রের গল্প ৷ তাঁর জীবন-সংগ্রামের গল্প ৷ ছোটবেলায় তিনি পত্রিকা হকারি করেছেন ৷ কিন্তু বিলির আগে সবগুলি পত্রিকা পড়ে ফেলতেন ৷ তিনি বিয়ে করেন নি ৷ কারণ তিনি ভাবতেন বিয়ে করলে স্বার্থপর হয় যেতে পারেন ৷ একবার তাঁর এক অধঃস্থন গবেষক তাঁর কাছে ছুটি চেয়েছিল ৷ তাঁর বাচ্চাদের একটি বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে নিয়ে যাবেন ৷ কালাম তাঁর ছুটি মঞ্জুর করলেন ৷ কিন্তু সেই ভদ্রলোক গবেষণার কাজে এত মত্ত ছিলেন যে ভুলেই গেলেন ছেলেদের প্রদর্শনীতে নিয়ে যাবার কথা ৷ রাত্রিতে ঘরে ফিরার সময়, সেই কথা তাঁর মনে এল ৷ তিনি তিনি ভয়ে ভয়ে তাঁর স্ত্রীর কাছে মাপ চাইতে গেলেন ৷ কিন্তু তাঁর স্ত্রী বললেন, ‘তুমি তো তোমার ম্যানাজারকে পাঠিয়েছিলে ৷ তিনিইতো বাচ্চাদের প্রদর্শনী দেখিয়ে এনেছেন ৷’
পরে জানা গেল সেই ম্যানাজার আব্দুল কালাম ৷ গবেষকের কাজের মুগ্ধতা দেখে কালাম নিজেই বাচ্চাদের প্রদর্শনী দেখিয়ে এনেছেন ৷ অধঃস্থন গবেষকের ম্যানাজার পরিচয়ে ৷
এর কয়েক বছর পরের কথা ৷ একদিন দুপুরে একটি টি.এস.আর. বাহিনীর সদরে মধ্যাহ্ন ভোজন করছি ৷ আবহে সন্তুরের আওয়াজ ৷ তবে বোকা বাক্স খোলা ৷ ডিজিপি সহ অনেক বড় বড় সাহেবও উপস্থিত ৷ ঘটনাক্রমে সেদিন মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেবেন ৷ টিভিতে বার বার আব্দুল কালামের ছবি আসছিল ৷ আমি আব্দুল কালামের চুলের স্টাইলের প্রশ্নটি রাখলাম ৷ মহা নির্দেশক শ্রীযুক্ত জি.এম. শ্রীবাস্তব আমার দীর্ঘদিনের পুষে রাখা প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলেন ৷ জন্ম থেকে আব্দুল কালামের একটি কান অন্যটি থেকে ছোট ৷ তাই তাঁর এই চুলের বাহার ৷
আমি মনে মনে বললাম, ‘মাশাল্লা !’

উদাল




ত্রিপুরা ছাড়া ভারতবর্ষের অন্য কোন রাজ্যে দেববর্মা রাজারা রাজত্ব করেছেন, এই তথ্য আমার জানা ছিল না ৷ বলতে গেলে কাকতালীয় ভাবে আমি একদিন এই সত্য জানতে পারি ৷ ২০০৫ সালের শেষ দিকের ঘটনা ৷ আমি তখন ধলাই জিলার পুলিশ সুপার ৷ মনু থানার সাথে পুলিশের একটি ডাক-বাংলো আছে ৷ ডাক-বাংলোর সামনে একটি হাওয়া-মহল ৷ সেদিন বিকেলে হাওয়া-মহলে বসে আছি ৷ সাথে আমার ডি.আই.জি শ্রী ধূর্জটি গৌতম সাহেব I তখন ধলাই জিলায় উগ্রপন্থা চরমে পৌঁছেছে ৷ কিছু আগে উগ্রপন্থী-বিরোধী অভিযান নিয়ে একটি মিটিং ছিল ৷ শেষ হওয়ার পর আমরা দু`জন ছাড়া অন্যরা সবাই একে একে ফিরে গেছে ৷ আমরাও ফিরব ফিরব করছি ৷ শেষ চায়ের অপেক্ষা ৷ শরতের বিকেল ৷ পরিবেশ খুবই মনোরম ৷ হঠাৎ গৌতম সাহেবের দৃষ্টি দূরের গাছের সারির উপর নিবদ্ধ হল ৷ তিনি খুশি মনে একটি বাংলা কবিতা আবৃত্তি করলেন ৷ কবিতার লাইনে ‘উদাল’ কথাটি কয়েকবার ঘুরে-ফিরে এলো ৷ আমি স্যরের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম ৷ তিনি দূরে বাড়িঘরের সারির মধ্যে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা গাছকে দেখিয়ে বললেন, ‘ উদাল গাছ ৷’
গাছটি ফুলে ভরে আছে ৷ আমি খুব মুগ্ধ হলাম ৷ এর আগে আমি উদাল গাছ দেখি নি ৷ আমাদের ছোটবেলায় নাইলনের দড়ির প্রচলন কম ছিল ৷ পাট আর উদালের দড়ি দিয়েই গবাদি পশুদের বাঁধা হত ৷ বিশেষ করে উদালের দড়ির খুব কদর ছিল ৷ রোদ-বৃষ্টিতেও খুব টেকসই থাকত ৷ আরেকটি কারণে উদাল গাছের বল্কলের প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল ৷ ক্লাস টুতে পড়ার সময় ছড়া ও ছবিতে আমরা ‘ছেলেদের রামায়ণ’ পড়তাম ৷ বইয়ের রামচন্দ্র,সীতা ও লক্ষ্মণ বনবাসে যাবার কালে বল্কল পরিহিত ছবিটি আমাকে আকর্ষণ করত ৷ আমি ভাবতাম কি গাছের বল্কল পড়ে এভাবে শরীর আচ্ছাদন সম্ভব ৷ আমার কল্পনায় উদাল গাছের ছাল ছাড়া অন্য কিছু মনে আসত না ৷
পরে একদিন মনুতে উগ্রপন্থী বিরোধী অভিযান থেকে ফেরার সময় উদাল গাছটি সামনা-সামনি দেখতে গিয়েছিলাম ৷ গাছটির মাঝারি গড়ন৷ একটু লম্বাটে ৷ পাতাগুলি জুড়া লাগানো ৷ গাছের ফুলগুলি কিছুটা ক্রিম-কালারের ৷ তারপর আমি বদলি হয়ে গেলাম ৷ সম্প্রতি খবর নিয়েছিলাম ৷ মনুর সেই উদাল গাছটি মরে গিয়েছে ৷ গাছের নীচে জল জমে ৷
এর কয়েক বছর পরের কথা ৷ আমি তখন আগরতলায় ৷ পুলিশ সদরে ৷ অরুন্ধতী নগর পুলিশ আবাসনে থাকি ৷ রাস্তা প্রশস্থ করার জন্য মাটি কাটা হচ্ছে ৷ বুল-ডজার দিয়ে ৷ বিদ্যুৎ দপ্তরের অফিসও ভাঙ্গা পড়েছে ৷ সাথে পাকা দেয়াল ৷ হঠাৎ আবিষ্কার করলাম একটি উদাল গাছও উপরে ফেলা হয়েছে ৷ রাত্রিতে ইন্টারনেট নিয়ে বসলাম ৷ উদ্দেশ্য গৌতম সাহেবের আবৃত্তি করা উদাল গাছ নিয়ে কবিতাটি বের করে পড়া৷ কিন্তু কবিতাটি পেলাম না ৷ উদাল গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ইত্যাদি পেলাম৷ আর পেলাম আসামের উদালগুড়ি জিলার নামের সুলুক ৷ উদালগুড়ি মঙ্গলদই লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ৷ একটি বিশাল উদাল গাছের গুড়িকে বেষ্টন করে গড়ে উঠেছে এই জিলা শহর ৷ আমি কখনো উদালগুড়ি যাইনি ৷ তবে আমার এক অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মী কানুনগো স্যরের মুখে উদালগুড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গল্প শুনেছি ৷ তাঁর ছোটবেলা কেটেছে উদালগুড়িতে ৷
আমাকে সবচেয়ে বেশী অভিভূত করল উদাল নামে এক রাজপুত সেনাপতির বীরত্বের কাহিনী ৷ দ্বাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বর্তমান উত্তর প্রদেশের মাহোবা বলে একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল ৷ সেই রাজ্যের রাজা পরিমল দেববর্মন৷ তাঁর সেনাপতি ছিলেন দশরাজ ৷ দশরাজের প্রতি রাজা পরিমল কৃতজ্ঞ ছিলেন৷ কারণ এক যুদ্ধের সময় মহারাজের প্রাণ বাঁচাতে দশরাজ নিজের প্রাণ বলিদান দেন ৷ এই কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরূপ রাজা তাঁর সেনাপতির বড়ছেলে উদালকে পুত্রস্নেহে বড় করেন ৷ উদালের ছোটভাই আলহা ৷ দুজনেই বড় হয়ে বড় যোদ্ধা হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন ৷ উদাল ছিলেন ঘোড়-সওয়ার আর আলহা হাতি-সওয়ার ৷ দুজনেই ছিলেন মাহোবা রাজ্যের সর্বকালের বীর যোদ্ধাদের অন্যতম ৷ উদাল একাই কমপক্ষে বাইশটি যুদ্ধে মাহোবাকে একক বীরত্বে জয়ী করেন ৷ কথিত আছে, আলহা ও উদালচক নামে মাহোবা শহরে দুটি চৌমাথা রয়েছে ৷ সেখানে সেনাপতি উদালের একটি প্রতিকৃতিও আছে ৷
দুই ভাইয়ের শেষ যুদ্ধ হয়েছিল পৃথ্বীরাজ চৌহানের সাথে ৷ যুদ্ধে মাহোবা সেনারা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে সেনা-বিন্যাস করে ৷ এর একটিতে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মহারাজ পরিমল দেববর্মন স্বয়ং ৷ অন্য দুইটি দলের ভার ছিল সেনাপতি উদাল ও আলহার উপর ৷ যুদ্ধে উদালের দল পরাজিত হয় পৃথ্বীরাজ চৌহানের কাছে ৷ কিন্তু পৃথ্বীরাজ চৌহানসহ তাঁর সেনাপতি পুন্ডীর উদালের হাতে গুরুতর জখম-প্রাপ্ত হন ৷ পৃথ্বীরাজ চৌহানকে মারার জন্য উদাল যখন এগিয়ে যাচ্ছিলেন, পাশ থেকে পৃথ্বীরাজ চৌহানের এক বিশ্বস্ত বন্ধু চৌদা রাই উদালকে হত্যা করেন ৷ ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে আলহা বদলা নিতে এগিয়ে যান ৷ কিন্তু তাঁদের গুরু গোরক্ষনাথ খবর পেয়ে, রাজপুত জাতির সার্বিক উন্নতির কথা চিন্তা করে তাঁকে বিরত করেন ৷ আলহা যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে শান্তির উদ্দেশে হিমালয়ে চলে যান ৷
গৌতম সাহেব এখন অবসর জীবন কাটাচ্ছেন ৷ একদিন যাব স্যরের কাছে উদালের কবিতার সন্ধানে ৷

হাম-শকল




প্রণব বোস বছর খানেক হল মারা গিয়েছেন ৷ ত্রিপুরা পুলিশে তাঁর মত স্টাইলিস্ট অফিসার কমই দেখেছি ৷ আমার সৌভাগ্য পুলিশের চাকুরীতে যোগ দিয়ে তাঁর সহচর্য পেয়েছি ৷ হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ পেয়েছি ৷ তিনি তখন মহকুমা পুলিশ আধিকারিক উদয়পুর ৷ তাঁর বন্ধুত্ব ছিল আমার এক পিশেমশাইয়ের সাথে ৷ দুজনে একসাথে কলেজে এন.সি.সি. করেছেন ৷ এই পরিচিতি তাঁর সাথে আমার অনেকটা আত্মিক বন্ধনের সৃষ্টি করেছিল ৷
পুলিশের চাকুরীতে যোগ দেবার আগে স্যরকে আমি কখনো দেখিনি৷ কিন্তু প্রথম দিন দেখেই মনে হল তাঁকে যেন খুব দেখেছি ৷ আমার এই উপলব্ধি আমার এক অধঃস্থন সহকর্মীকে বললাম ৷ অফিসারটি খুবই চটপটে ৷ তিনি বললেন, ‘স্যরকে সিনেমায় দেখেছেন ৷ প্রেম চোপরার যমজ ভাই ৷ তাই এমন মনে হচ্ছে ৷’
বলতে দ্বিধা নেই সিনেমার প্রখ্যাত ভিলেন প্রেম চোপরার সাথে তাঁর চেহারার অদ্ভুত মিল ছিল ৷ কোন রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই ৷ যেন যমজ ভাই ৷ এখানে বলে রাখা প্রয়োজন সিনেমার ভিলেনরা ব্যক্তিগত জীবনে সাধারণত খুবই মানবিক হন ৷ তাই তাঁরা বুঝতে পারেন কোন মানবিক মূল্যবোধ লঙ্ঘিত হলে দর্শকরা প্রভাবিত হবেন ৷ সেদিন সেই জুনিয়র অফিসারের সাথে কথা প্রসঙ্গে, অধুনা প্রয়াত প্রখ্যাত ব্যবহারজীবী দিলীপ সরকারের সাথে পুরানো দিনের অভিনেতা বিশ্বজিতের সাদৃশ্যের কথাও এসেছিল ৷ এছাড়া প্রয়াত হর্ষদ মেহতার সাথে এক আমলার চেহারার অদ্ভুত মিল খুঁজে পেয়েছিলাম ৷
পরবর্তীতে রক্ত-সম্পর্ক বিহীন দুটো মানুষের মধ্যে চেহারার এমনি অনেক মিল খুঁজে পেয়েছি ৷ প্রয়াত দীপক শঙ্কর দেব চৌধুরী স্যরের সাথে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভেঙ্কাইয়া নাইডুর চেহারার অদ্ভুত মিল আমি দেখতে পাই ৷ বিষয়টা আমাকে খুবই ভাবায় ৷ এখন পৃথিবীর জন-সংখ্যা প্রায় সাতশ কোটি ৷ আজ থেকে প্রায় বাহাত্তর হাজার বছর আগে পৃথিবীতে মাত্র হাজার-খানেক লোক ছিল ৷ বিজ্ঞান বলে এটা বিচিত্র নয় যে প্রতিটি মানুষের একটি হাম-শকল পৃথিবীর কোথাও না কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে ৷ এই হাজার-খানেক লোকের জিনই আমাদের মধ্যে বয়ে চলেছে ৷ চাইনিজ, জাপানিজ ও কোরিয়ানদের মধ্যে এই ধরনের হাম-শকলের সংখ্যা আরও বেশী ৷
মা-কালীর শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের কাহিনী আমরা জানি ৷ দুই অসুরের অত্যাচার থেকে ধর্তিকে বাঁচাতে মা অসুর-নিধন যজ্ঞে মেতে পড়েন ৷ অসুরদের রক্ত মাটিতে পড়া মাত্র জন্ম নিচ্ছিল রক্তবীজ অসুরের ৷ তাই তিনি সেই রক্ত মাটিতে পড়তে দিচ্ছিলেন না ৷ রক্ত পান করছিলেন ৷ তাঁর সেই সংহার মূর্তিতে সৃষ্টি ধ্বংস হবার উপক্রম হয়েছিল ৷ তাঁকে থামাতে শেষ পর্যন্ত দেবাদিদেব মহাদেবকে নামতে হয়েছিল ৷ এই কাহিনীর সত্যাসত্যতে আমি যাব না ৷ তবে একটি বিষয় আমাকে খুব আকৃষ্ট করে৷ তখনকার সময়ে পৃথিবীর অবস্থা ৷ নিষ্কলুষ মাতৃ-জঠরের মত ৷ তাই বুঝি রক্ত-কণা মাটিতে পড়া মাত্র জন্ম নিচ্ছিল একেকটি অসুরের ৷
এমনই কিছু বিচিত্র জন্ম-বৃত্তান্ত আমরা দেখতে পাই মহাভারতে ৷ মহাকাব্যের আদিপর্বে আছে ধার্মিক রাজা উপরিচর বসুর গল্প ৷ মহারাজ বসু চেদিরাজ্যের রাজা ছিলেন ৷ তাঁর একটি আকাশ-যান ছিল ৷ রাজপ্রাসাদ থেকে অনেক দূরে বসন্তকালে তিনি একবার মৃগয়ায় বেরিয়েছেন ৷ ঐ প্রাকৃতিক পরিবেশে যে-কোন কারণেই হোক তাঁর রেতঃস্খলন ঘটে ৷ তিনি এই রেত: নষ্ট হতে দেন না ৷ এই স্পার্মকে একটি গাছের পাতায় নেন ৷ তারপর তাঁর পোষা শ্যেন পাখির মুখে করে পাঠিয়ে দেন তাঁর মহিষীর কাছে ৷ কিন্তু সেই রেত: রাজপ্রাসাদ পর্যন্ত পৌছার আগেই শ্যেন পাখির মুখ থেকে যমুনার জলে পড়ে যায় ৷ আর সেই স্পার্ম গিলে একটি মাছ গর্ভবতী হয়ে পড়ে ৷ মাছটি আসলে একটি শাপগ্রস্ত অপ্সরা ৷ আদ্রিকা ৷ আদ্রিকার গর্ভে সত্যবতী ও তাঁর যমজ ভাইয়ের জন্ম হয় ৷ অনেকে এই ঘটনার সাথে সারগ্যাট মাদারের(surrogate mother) সাদৃশ্য খুঁজে পান ৷ আবার অনেকে বলেন বয়স হয়ে যাওয়ায় অপ্সরা আদ্রিকার স্থান হয়েছিল ধীবর পল্লিতে ৷ নিঃসন্তান রাজা উপরিচর বসু বংশ রক্ষার্থে গিয়েছিলেন ধীবর পল্লিতে ৷ বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপনে ৷ তাই এই গল্পের অবতারণা ৷
তবে সত্যি হউক কিংবা মিথ্যা মহাভারত থেকে আমরা টেস্টটিউব বেবির আভাস পাই ৷ দ্রোণাচার্যের জন্ম মাটির কুঁজোতে ৷ পূর্ণ-যৌবনা অপ্সরা ঘৃতাচীকে যমুনা নদীতে স্নান করতে দেখে একবার ঋষি ভরদ্বাজের রেতঃস্খলন হয় ৷ তিনি সেই রেতঃকে মাটির কলসিতে প্রতিস্থাপন করে দ্রোণের জন্ম নিশ্চিত করেন ৷ এখানে ঘৃতাচীর সাথে মুনি ভরদ্বাজের মিলনের কথা উহ্য রাখা হয়েছে ৷ এমনিভাবে দেখতে গেলে দুর্যোধনদের একশত ভাই ও বোন দুঃশলার জন্মও টেস্ট-টিউব পদ্ধতিতে৷ কিংবা একে ক্লোনিং হিসাবেও ব্যাখ্যা করা যায় ৷ যদিও ক্লোনিং হলে দুর্যোধনের ভাইয়েরা একে অপরের হাম-শকল হওয়ার কথা৷
রামায়ণ সম্পর্কে আমার জ্ঞান খুবই সীমিত ৷ তবে রামায়ণের মন্দোদরীকে নিয়ে আমাদের উত্তর জিলার ধর্মনগরে বিচিত্র এক কাহিনী প্রচলিত আছে ৷ কিছুটা অশ্লীল ৷ তাই আমাকে মার্জনা করবেন ৷ বিশ্রসবা মুনির ছেলে রাবণ খুবই জ্ঞানী লোক ৷ তাঁর মা কৈকেশী ক্ষত্রিয় ৷ রাবণের সাথে রানী মন্দোদরীর পরিচয় নাকি গুরুগৃহে ৷ সেখানে মন্দোদরী গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন ৷ সেই হিসাবে তাঁকে রাবণের কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করতে হত ৷ একদিন রাবণের কাপড় ধুতে গিয়ে মন্দোদরী পড়লেন মহা মুস্কিলে ৷ কাপড়ের মধ্যে একটি আঠালো বস্তু শক্ত হয়ে লেগেছিল ৷ মন্দোদরী কোন উপায় না পেয়ে দাঁত দিয়ে তা পরিষ্কার করেন ৷ এই করতে গিয়ে কিছুটা বস্তু মন্দোদরীর পেটে চলে যায়৷ আসলে সেটা ছিল রাবণের শক্ত হয়ে যাওয়া রেত: ৷ মন্দোদরী গর্ভবতী হয়ে পড়েন ৷ তিনি তা গোপন রাখেন ৷ গুরুগৃহে পাঠ শেষের পর যাবার সময় রাবণের সাথে মন্দোদরীর বিয়ে হয় ৷ বৌকে নিয়ে যাবার পথে রাবণকে একটি স্থানে দাঁড়াতে হয় ৷ জঙ্গলাকীর্ণ স্থান ৷ কিন্তু কিছু করার নেই৷ প্রাকৃতিক কাজ সারতে মন্দোদরী রাস্তার পাশের জঙ্গলে গেলেন ৷ কিন্তু তাঁর ফিরতে দেরি হচ্ছিল ৷ রাবণ অধৈর্য হয়ে রানীর নাম ধরে হাঁক পাড়লেন ৷ রাবণের ডাকে মন্দোদরীর গর্ভপাত ঘটল৷ একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হল ৷ সেই সন্তানকেই হাল-চাষ করতে গিয়ে জনক রাজা কুঁড়িয়ে পান ৷ তিনিই রামায়ণের সীতা ৷ রামায়ণের শেষ দিকে সীতার পাতাল প্রবেশ ঘটে ৷ আবার মহাভারতে তিনি কৃষ্ণা হয়ে ফিরে আসেন ৷ দ্রুপদ রাজের কন্যা হয়ে ৷ পাতাল থেকে যজ্ঞের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেন ৷ সেই অর্থে দ্রৌপদী ও সীতা একে অপরের হাম-শকল ৷