Sunday, 5 July 2015

রাস্তা বিভাজনের শঙ্কু



গত বছরের কথা ৷ আমি তখন ট্রাফিক পুলিশের সুপার ৷ অরুন্ধতী নগর পুলিশ আবাসনে থাকি ৷ ঘড়িতে তখন ভোর তিনটে কিংবা সাড়ে তিনটে ৷ হঠাৎ মোবাইলে ফোন ৷ চমকে উঠলাম ৷ কিন্তু ফোনের পর্দায় নাম্বার দেখে আশ্বস্থ হলাম ৷ ফোনের উৎস টি.এস.আরের এক সুবেদার ৷ এপ্রিলের এক তারিখ ৷ বোকা বানানোর জন্য ফোন ৷ ছেলেটি গাড়োয়ালের ৷ কিছুটা মদ্যপানের দোষ আছে ৷ কিন্তু আমি তাকে ভালোবাসি ৷ তাই বিরক্ত হলেও প্রকাশ করি না ৷ ছেলেটির সাথে আমার পরিচয় এক দশকেরও আগে ৷ তখন আমি এক টি.এস.আর. বাহিনীর কমান্ড্যান্ট ৷ ছেলেটি শিক্ষিত ৷ অফিসের কাজ করত ৷ তার মধ্যে একটি পাহাড়ি সারল্য ছিল ৷ যার সাথে আমি জিম করবেটের লেখা পড়ে পরিচিত ছিলাম ৷ তার পড়াশুনা আর্মি স্কুলে ৷ চলা ফেরায় খুবই স্মার্ট ৷
তার কাছে আমি প্রথম যশবন্ত সিং রাওয়াতের গল্প শুনি ৷ রাওয়াত ১৯৬২র চীন-ভারত যুদ্ধে বীরগতি প্রাপ্ত হন ৷ কিন্তু এর আগে ১০০০০ হাজার ফিট উঁচুতে অবস্থিত হিমালয়ের নৌরাঙ্গ অঞ্চলে দুটি স্থানীয় বালিকা সেলা ও নুড়াকে নিয়ে পুরো এক চাইনিজ পল্টনকে তিনদিন আটকে রাখেন ৷ এই বীরত্বের জন্য তাঁকে মরণোত্তর মহাবীর চক্রে ভূষিত করা হয় ৷  কালক্রমে তিনি ঐ এলাকায় কর্মরত জওয়ানদের কাছে তিনি সাধুবাবার মর্যাদা পান ৷ তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁকে যথাসময়ে সাম্মানিক পদোন্নতি দেওয়া হয় ৷ সবশেষে সাম্মানিক ক্যাপ্টেন হিসাবে অবসরে যান৷
বোকা প্রতিপন্ন হবার পর সেদিন আর ঘুম আসে না ৷ খানিকক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসে প্রভাতী পত্রিকা পড়ি ৷ তারপর প্রাতঃভ্রমণের সময় হলে বেরিয়ে পড়ি ৷ আগরতলা দূরদর্শন কেন্দ্র অতিক্রম করে বাধারঘাট দশরথ দেব স্টেডিয়ামের দিকে এগিয়ে যাই ৷ প্রথম তেমাথা রাস্তার মোড়ে গিয়ে দাঁড়াতে হয় ৷ আমার প্রতিদিনের সাথী আমার জন্য অপেক্ষা করছেন ৷ তিনি আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট করান ৷ রাস্তা বিভাজনের একটি শঙ্কুর প্রতি ৷ আমরা একে রোড ডিভাইডার কোণও বলি ৷ শঙ্কুটি নতুন ৷ একাকী দাঁড়িয়ে গলি রাস্তার মাঝ-বরাবর ৷ এরকম ছোট রাস্তায় ট্রাফিক কোণের ব্যবহার হয় না ৷ তাছাড়া নতুন কোনও কোণ আমাদের স্টোর থেকে বেরিয়েছে বলেও মনে ছিল না ৷ আমরা কিছুটা এগিয়ে গেলাম ৷ ডি.আই.জি. অফিসে গার্ড আছে ৷ টি.এস.আর. সেন্ট্রিকে নিজের পরিচয় দিলাম ৷ সেখান থেকে শঙ্কুটি দেখা যাচ্ছিল ৷ তাকে  বললাম কাউকে পাঠিয়ে শঙ্কুটি তাদের পোস্টে এনে রাখতে ৷ বেলা হলে আমার ট্রাফিকের লোক এসে নিয়ে যাবে ৷ সেন্ট্রি সম্মতি জানাল ৷ ফেরার পথে দেখলাম শঙ্কুটি সেন্ট্রি পোস্টের পাশে শোভা পাচ্ছে ৷ আমিও ট্রাফিক কন্ট্রোলে বলে দিলাম ৷ শঙ্কুটি সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য৷
এরপর আর শঙ্কু বিষয়ক খবর আমি কয়েকদিন নিইনি ৷ দিন ছয়েক পরের কথা ৷ প্রাতঃভ্রমণ থেকে ফিরছি ৷ সাথে আমার সেই বন্ধু ৷ সেই তেমাথা রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছি ৷ এবার সেদিনের মত বিদায় জানাব ৷ হঠাৎ পাখির কিচির-মিচিরে আমাদের নজর গেল সামনের কাঁঠাল বাগানের দিকে ৷ আগরতলা দূরদর্শন কেন্দ্রের পূর্ব-দিক লাগোয়া এই বাগানটি স্বর্গীয় কৃষ্ণদাস ভট্টাচার্যের ৷ তিনি এক সময় ত্রিপুরার মন্ত্রী ছিলেন ৷ বাগানটির চার পাশে এখন দেয়াল হয়েছে ৷ কিছুদিন আগেও জায়গাটি ছিল উন্মুক্ত ৷ আমাদের ট্রাফিকের এক কনস্টেবল ফাঁসিতে আত্মহত্যা করেছিল ৷ একটি কাঁঠাল গাছ থেকে ৷ তাঁর নাম বলছি না ৷ কিন্তু সেই গাছে আরও লোক ফাঁসিতে ঝুলেছে ৷ গাছটি এখনো আছে ৷ কাঁঠালের মরশুমে টাল হয়ে গাছের নিচে কাঁঠাল পড়ে থাকে ৷ কেউ নেয় না ৷ কাঁঠাল গাছটির দিকে উকি মেরে তাকিয়ে দেখলাম ৷ এবছরও ফলন ভালো ৷ কিন্তু আমাকে বিস্মিত করল একটি দৃশ্য ৷ কাঁঠাল গাছের নিচে উকি দিচ্ছে  রাস্তা বিভাজনের সেই শঙ্কুটি ৷ আর পাখিরা পালা করে এর উপর বসে সুখ মেটাচ্ছে ৷
      একটা কথা আছে যুদ্ধ, দাবানল আর বেমানান বিয়ে কোনও নিয়ম মানে না ৷ আমাদের সিপাইটি বেমানান বিবাহ সম্পর্কের শিকার ৷ শোনা যায় তার ছেলে নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিল ৷ কিন্তু সম্পর্কের দৃঢ়তা ছিল না ৷ সে ছিল সাত্ত্বিক প্রকৃতির লোক ৷ কিছুদিনের মধ্যে অবসরে যাবে ৷ সেদিন দুপুরে ডিউটি থেকে ফিরে ছেলের বৌয়ের মুখে এমন কিছু কথা শুনে, যা সে সহ্য করতে পারেনি ৷ কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে গলায় দড়ি দেয়৷
অথচ তার কর্মদক্ষতা ছিল দৃষ্টান্তমূলক ৷ এর জন্য জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছে ৷ শহরের এক ব্যস্ততম মোড়ে সে ট্রাফিক ডিউটি করত৷ তার দৃঢ়তার একটি নমুনা দিয়ে গল্প শেষ করছি ৷ সেদিন দুপুর ৷ এক মাননীয় মন্ত্রী ফিরছেন দপ্তর থেকে ৷ মন্ত্রী মহাশয়ের কনভয় চৌমাথায় পৌঁছামাত্র ঘটনাক্রমে সে সিগনাল বদলে দিয়েছে ৷ ফলে মাননীয় মন্ত্রীর কনভয় থেমে গেছে ৷ এই অবস্থায় মন্ত্রীর এসকর্টের কমান্ডার তাকে গিয়ে বলল তাদের যেতে দিতে ৷ শুনে সে বলল, ‘আপনি এবং আমি একই মহা নির্দেশকের অধীনে কাজ করি ৷ যতক্ষণ আমি এই পোস্টে আছি ততক্ষণ আমার কথাই শেষ কথা ৷ আপনি যাকে খুশি নালিশ করতে পারেন ৷’
আমার বন্ধু কিংবা আমি দুজনের কেউই ট্রাফিক কনস্টেবলের আত্মাকে বিরক্ত করতে সেদিন সাহস করিনি ৷ রাস্তা বিভাজনের শঙ্কুটি এখনো হয়তো সেই কাঁঠাল গাছ তলায় পাওয়া যাবে ৷

Saturday, 4 July 2015

ঈশ্বর কণার সন্ধানে



     
     

দীপক ভোরা একটি পরিচিত নাম ৷ অন্তত: আমার প্রজন্মের লোকদের কাছে৷ তিনি ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিসের অবসরপ্রাপ্ত অফিসার ৷ কিন্তু আমাদের কাছে তাঁর একটি বড় পরিচয় টিভি অ্যাংকর হিসাবে ৷ আমরা যখন বড় হয়ে উঠছি তখন তিনি দূরদর্শনের সকালের অনুষ্ঠান করতেন৷ বলতে দ্বিধা নেই অনুষ্ঠানটি ছিল জনপ্রিয় ৷ মাস দুয়েক আগে দীপক ভোরা ত্রিপুরায় এসেছিলেন ৷ দক্ষিণ সুদান সরকারের রাষ্ট্রদূত হয়ে৷ সঠিক ভাষায় বলতে গেলে মুখ্য পরামর্শদাতা৷ তাঁর সাথে আলাপ-চারিতার সুযোগ নষ্ট করতে চাইনি ৷ তাই বন্ধুবর মানস পাল সহ গিয়েছিলাম দেখা করতে ৷ রাজ্য অতিথিশালায় ৷ অনেকক্ষণ ছিলাম ৷ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ৷ আফ্রিকান জ্ঞান (African wisdom) নিয়ে গল্প হল ৷ প্রসঙ্গক্রমে নেলসন্ ম্যান্ডেলার কথা এল৷ তাঁর সাথে সাক্ষাৎকারের গল্প শুনালেন ৷ ম্যান্ডেলার মুখে শোনা একটি গল্প শুনালেন ৷ এক সম্পন্ন আফ্রিকান ব্যক্তির ১৭ টি ছাগল ছিল ৷ তাঁর দুই ছেলে৷ এক স্ত্রী ৷ মরার আগে তিনি উইল করে গেলেন, এর অর্ধেক পাবে ছোট ছেলে৷ এক তৃতীয়াংশ বড় ছেলে ৷ আর এক নবমাংশ তাঁর স্ত্রী ৷ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে মহা সমস্যার সৃষ্টি হল ৷ কি করে জ্যান্ত অবস্থায় সতেরটি ছাগলের এরকম বিচিত্র ভাগাভাগি সম্ভব ?
ওয়ারিশরা এক বিজ্ঞ ব্যক্তির শরণাপন্ন হলেন ৷ তিনি মুচকি হেসে তাঁর এক বন্ধুর কাছ থেকে একটি ছাগল কিছুক্ষণের জন্য চেয়ে নিলেন ৷ তারপর ছাগলটিকে সতেরটি ছাগলের দলে মেলালেন ৷ মোট ছাগলের সংখ্যা হল আঠারো ৷ এবার ছোট ছেলেকে আঠারোর অর্ধেক অর্থাৎ ৯ টি ছাগল দিলেন ৷ বড় ছেলেকে এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৬ টি ছাগল দিলেন ৷ স্ত্রী পেলেন এক নবমাংশ অর্থাৎ ২ টি ছাগল ৷ এভাবে মোট ১৭ টি ছাগলের ভাগ হল ৷ তাঁর বন্ধুর ছাগলটি বন্ধুকে ফিরিয়ে দিলেন ৷
আমার বন্ধু নন্দু পানিক্কর কয়েক বছর আগে ফেসবুকে এমনই একটি ধাঁধা পোস্টিং করেছিল ৷ ধরুন আপনার কাছে ৫০ টাকা আছে ৷ আপনি এর থেকে খরচ করলেন ২০ টাকা ৷ আপনার হাতে রইল ৩০ টাকা৷ এবার আপনি খরচ করলেন ১৫ টাকা ৷ হাতে বাকি রইল ১৫ টাকা ৷ এবার এই ১৫ টাকা থেকে খরচ করলেন ৯ টাকা ৷ হাতে রইল ৬ টাকা সবশেষে এই ৬ টাকাও খরচ করে ফেললেন, হাতে মা ভবানী অর্থাৎ কোনও টাকা নেই ৷ এই বিনিময় যদি টেবিলের আকারে সাজাই, তাহলে বিষয়টা নিম্নরূপ দাঁড়াবে ৷


·        
খরচ
হাতে রইল
·        
২০
৩০
·        
১৫
১৫
·        
·        
মোট
৫০
৫১

উপরের সারণীতে চোখ বুলালে একটি মজার তথ্য লক্ষ্য করা যায় ৷ খরচের খাতায় আছে ২০+১৫+৯+৬= ৫০ টাকা৷ অথচ আমাদের হাতে ছিল ৩০+১৫+৬+0= ৫১ টাকা ৷ অজান্তেই ১ টাকা আমাদের হাতে এসে যায় ৷ এর সঠিক ব্যাখ্যা আমার জানা নেই ৷ তবে আমার মনে হয়েছে পরিসংখ্যানের পরিভাষায় ‘খরচ’ এবং ‘হাতে রইল’ দু’টি ভিন্ন গোত্রের৷ প্রথমটি ‘absolute frequency’, আর দ্বিতীয়টি ‘cumulative frequency’, অর্থাৎ একটি স্বতন্ত্র এবং অন্যটি সমষ্টিগত ৷
কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তরে নিজের মনে খুশি হতে পারি না ৷ ভাবি এই অতিরিক্ত টাকাটিই হয়তো ঈশ্বর কণা ৷

ডলুমাসি-সিন্ড্রোম




ডলুমাসি-সিন্ড্রোমশব্দটি আমার বানানো কোন আভিধানিক পরিভাষা নয় ডলুমাসিনামটি অমর কথা সাহিত্যিক শিবরাম চক্রবর্তীর লেখা থেকে নেওয়া ডলুমাসি সিন্ড্রোমনামটির অনুপ্রেরণা তাঁরই একটি গল্প পড়ে গল্পটি এক্ষণে আমার হাতে নেই ছোটবেলায় পড়েছি তাই মন থেকেই বলছি শিবরাম চক্রবর্তীর এক মাসি ছিলেন ভলুমাসি একবার তিনি তাঁর ডলুমাসিকে চিঠি লিখবেন সুদৃশ্য প্যাড কলম নিয়ে বসেছেন প্রথমে লিখলেনশ্রীচরণেষু ডলুমাসি…’ কিন্তু এই সম্বোধন বয়ান মনপুতঃ হল না দলামচা করে কাগজটি মাটিতে ফেললেন এরপর দ্বিতীয় প্রচেষ্টা এটাও পছন্দ হল না এবার তৃতীয় প্রচেষ্টা এভাবে প্যাডের কাগজ ছিঁড়তে ছিঁড়তে তেরতম প্রচেষ্টায় যখন চিঠি লিখে উঠতে পারলেন না তখন ধুত্তোর বলে উঠে পড়লেন ততক্ষণে ঘরময় পড়ে আছে ছিঁড়া কাগজের স্থুপ
আমারা অনেক সময়ইডলুমাসি সিন্ড্রোম’- আক্রান্ত লোকের দেখা পাই এইসব লোকেরা কোনও ড্রাফট ফাইনাল করে উঠতে পারে না শেষ মুহূর্তে হয়তো দেখা যায় প্রথম দিককার কোনও ড্রাফটই উত্তর হয়ে চলে যাচ্ছে এই ধরনের চরিত্র বস হয়ে বসলে খুবই অসুবিধায় পড়তে হয় এখন কম্পিউটার আসায় কিছুটা সুবিধা হয়েছে আগে যখন অফিস-কাছারিতে টাইপ-রাইটারের প্রচলন ছিল, তখন নিচু তলার কর্মীদের চরম ভোগান্তি হত এখনো অবশ্য কপি-পেস্ট করতে গিয়ে অনেক সময়ই প্যারাগ্রাফ গুলিয়ে যায়
আমার বিচারে এই ধরনের অফিসাররাফিলোঅর্থাৎ ফার্স্ট ইন লাস্ট আউট অফিসে সবার আগে আসেন৷ আর যান সবার শেষে প্রতিমাসে তাঁদের কমপক্ষে এক বোতলকারেক্টিং ফ্লুয়িডলাগে নোট-সিটে তাপ্পি লাগানো তাঁদের আরেক স্বভাব এই রকম আধিকারিককে নিয়েই আমার গল্প রাজ্যের বাইরের অফিসার এক্ষণে অবসরে চলে গেছেন প্রশাসনের যথেষ্ট শিখরে পৌঁছেছিলেন
তাঁর প্রথম ঝঞ্ঝাট শুরু হয়েছিল স্টেনোকে নিয়ে তাঁর ভাষায় স্টেনো পুং লিঙ্গ শব্দ স্টেনোর স্ত্রী-লিঙ্গ হচ্ছে স্টেনি তাই স্টেনোদের অফিসের নির্ধারিত সময়ের পরও থাকতে হবে একদিন এই কথা শুনে তাঁর স্টেনো-বাবু বললেন, ‘স্যার, আপনার কথাই মানছি ডিকটেশন দিন একটি লিখিত আদেশ বের করে দিন৷
- কাল দেব
- না স্যার, আজই দিন এর কত কারেকশন হবে কালকের কাজ আজ কিছুটা এগিয়ে রেখে যাই
এই মেমো আর সূর্যের আলো দেখেনি একদিন স্টেনো-বাবু তাঁর বসকে কিছু না জানিয়ে সন্ধ্যে ছটার দিকে বেরিয়ে গেলেন ঘটনাটি পরিকল্পিত সন্ধ্যার পর বস যখন স্টেনো বাবুর খুঁজ করলেন তখন অন্য স্টাফরা বলল, ‘স্যার,স্টেনো-বাবু সমিতির বৈঠকে যোগ দিতে গিয়েছেন আমাদের স্টেনো-বাবু সমিতির উচ্চ পদে আছেন স্যার রাজনৈতিক নেতাদের সাথে তাঁর সব সময় উঠা বসা
এই বানানো গল্প খুব কাজ দিয়েছিল পরদিন থেকে অফিসে স্টেনো বাবুর কদর বেড়ে যায় সমিতির কাজের বাহানায় তখন অফিস থেকে তিনি আগে আগে বেরিয়ে যান বসও কোনও বাধার সৃষ্টি করেন না অফিসের অন্যরাও একটু রেহাই পায় সাহেব একটু হলেও আগের চেয়ে তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে যান
কিন্তুডলুমাসি সিন্ড্রোম’- আক্রান্ত লোকেরা অফিসের কাজ নিয়েই শুধু বসে থাকেন না ভদ্রলোকের অভ্যাস ছিল টেলিফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলা মামুলি বিষয়ে অনেক সময় দেখা যেত অপর প্রান্তের কাইকে ফোনে ডিকটেশন দিচ্ছেন মোদ্দাকথা তাঁর ড্রাইভার, চাপরাসি কেউই তাঁর উপর খুশি ছিল না
ডিসেম্বরের এক শীতের রাত `টা নাগাদ সাহেব অফিস থেকে বেরিয়েছেন অফিসের গাড়িতে সাথে ড্রাইভারের পাশে একজন পিওন অফিস থেকে কিছুটা দূর এসে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল কিছুতেই ড্রাইভার গাড়ি চালু করতে পারল না অগত্যা ড্রাইভার এক অটো-ওয়ালাকে পাকরাও করল বলল, ‘আমার স্যারকে কোয়ার্টারে পৌঁছে দিবি একশত টাকার বেশী এক পয়সাও নিবি না
যখনকার কথা বলছি তখন মোবাইল পরিষেবা ছিল না একশত টাকা অনেক টাকা বস চলে যাবার পর পিওনটি কি করে ফিরা যায় ভাবছিল ড্রাইভার তাকে বলল গাড়িতে উঠে বসতে এবার চাবি ঘুরাতেই গাড়ি স্টার্ট হল পিওনকে অবাক করে গাড়ি তাকে অফিসে নামিয়ে দিল ইশারায় সবকথা বলে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে অন্যত্র অন্যত্র চলে গেল অফিসের গ্যারেজে গাড়ি রাখল না গাড়িতে কোনও বৈকল্য ছিল না
পরদিন বস অফিসে এলেন অন্য গাড়িতে একজন অফিসারের সাথে শেয়ার করে এসেই ড্রাইভারকে ডাকালেন বললেন, ‘তোমরা কি করে কাল রাত্রিতে ফিরলে ?’
- আপনি যাবার পর অনেকক্ষণ আমি ধরে গাড়ি স্টার্ট করার চেষ্টা করলাম কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না এরমধ্যে দেখি চারজন হোম-গার্ড নাইট প্যাট্রোলিং ডিউটিতে বেরিয়েছে তারাও আমাদের প্রচেষ্টা দেখছিল শেষে গাড়ি ঠেলতে তারা সাহায্য করল অবশ্য তাদের একশত টাকা দিতে হল গাড়ি এখন বাইরের গ্যারেজে ব্যাটারি পুরোপুরি বয়ে গেছে চার্জে বসিয়েছি দু`দিন লাগবে ঠিক হতে
বস ড্রাইভারের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা ব্যক্ত করলেন তার আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দিলেন