Monday, 18 January 2016

কথা কও , কথা কও , অনাদি অতীত ….


















গতকাল ছিল রবিবার ৷ অফিসেও বাড়তি কাজ ছিল না ৷ সস্ত্রীক গিয়েছিলাম বড়মুড়ায় ৷ ইকো পার্ক দেখতে ৷ ছুটির দিন হওয়াতে প্রচুর লোক সমাগম ৷ অধিকাংশই পিকনিক পার্টি ৷ মাইকে ‘লুঙ্গি ড্যান্স’ থেকে শুরু করে পুরাতনী ‘আমি যে জলসাঘরে…’, সব রকম সুরই ভেসে আসছিল ৷ ইলেকট্রিফাইয়িং পরিবেশ ৷ দেখে ভালো লাগল ৷ কিছুদিন আগেও এখানে উগ্রবাদীরা রাজ করত ৷ পার্কের ঠিক পাশেই ও.এন.জি.সি.-র প্রকৌশলী লাকি শ্রীবাস্তবদের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে আমাদের পুলিশ ভাইয়েরাও প্রাণ দিয়েছিল ৷
আগরতলা থেকে আমরা রওয়ানা হই সকাল এগারটা নাগাদ ৷ পৌঁছাতে ঘন্টা-খানেক লাগল ৷ বনভোজনের এলাকা পার্কের বাইরে ৷ রাস্তার দক্ষিণ পাশে ৷ প্রবেশ মূল্য দশ টাকা ৷ দেরি না করে, টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম বড়মুড়া ইকো পার্কে ৷ বড়মুড়ার আসল নাম নাকি বারমুড়া ৷ বারটি মুড়া বা চূড়ার সমন্বয়ে বড়মুড়া পাহাড় ৷ কালক্রমে আখ্যায়িত হয় বড়মুড়া নামে ৷ পার্কটি গড়ে উঠেছে এমনি একটি মুড়াতে ৷ পাহাড়র গা-বেয়ে ইট-বাঁধানো পায়ে চলা বনবীথি ৷ মাঝে-মাঝে সিমেন্ট ও টাইলসে মোড়া সিঁড়ি ৷ চরাই উৎরাই ৷ স্থানে স্থানে বাহারি বাগান-বিলাস ৷ ছোট ছোট চন্দ্রমল্লিকা ৷ এখানকার গাছের বৈচিত্র্য দেখার মত ৷ শাল, সেগুন, চামল, কড়ই, কনক, জাম, গামার থেকে শুরু করে নাগেশ্বর, ওক, চাঁপা, কামিনী, অর্জুন, আমলকী, প্রভৃতি প্রজাতির গাছও নজরে এল ৷ বাহারি প্রজাপতি ৷ সাথে অসংখ্য প্রজাতির বাঁশ গাছ ৷ মাঝে মাঝে জলাশয় ৷ জল অনেকটা শুকিয়ে এসেছে ৷ ছোট ছোট হাওয়া মহল ৷ বাঁশের কটেজ ৷ এক জায়গায় দেখলাম গাঁদা ফুলের বাগ তৈরি হচ্ছে ৷ জিজ্ঞেস করে জানলাম দেশি গাঁদা ৷ শীতের রোদ্দুরে দু`তিন কিলোমিটার পথ চলতে বেশ লাগল ৷
পার্ক থেকে বেরিয়ে এসে ক্যাফেটেরিয়াতে ঢুকলাম ৷ হর্ণবিল ক্যাফেটেরিয়া ৷ টাইলসের মেঝে ৷ আসবাব এবং ভেতরের সাজ-সজ্জা বাঁশ-বেতের ৷ পরিবেশের সাথে মানানসই ৷ প্লেটের উপর কলাপাতা পেতে খাবার পরিবেশন হয় ৷ খাবার-দাবার খুবই সস্তা ৷ বিশেষ করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিচারে ৷ ফুল-প্লেট এগ-চাউমিন ষাট টাকা ৷হাফ-প্লেট ত্রিশ টাকা ৷ দু`টি টেবিলে চারজন করে বসা ছিল ৷ আমাদেরই মত ভ্রমণ পিপাসী ৷ একদল আবার পরিচিত ৷ স্কুলের সহপাঠীর ছোট বোন সুবর্ণা ৷ আমাদের ছোটবেলা কেটেছে একই শহরে ৷ এখন সে চল্লিশের কোঠায় ৷ অনেকটা ভারী হয়ে গেছে ৷ তার বান্ধবী বলল আমি তাকে চিনি ৷ আমার এক বন্ধুর নাম বলল ৷ আগরতলার ৷ আসলে ওকে দেখেছি সামাজিক অনুষ্ঠানে ৷ দু`জনেই এসেছে তাদের অর্ধেক সহ ৷ আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল ৷ ওরা বেরিয়ে গেলে সুবর্ণার গুণের কথা স্ত্রীকে বললাম ৷ সুবর্ণা খুব সুন্দরী ৷ ভালো নাচতে পারত ৷ রবীন্দ্র গীতিনাট্যে অংশ নিত ৷ চিত্রাঙ্গদার ভূমিকায় ওর অভিনয় আমাদের ছোট শহরে যথেষ্ট দাগ কেটেছিল ৷ চন্ডালিকাতেও তার অভিনয় দেখেছি ৷ মেয়েরা নাচ ছেড়ে দিলে মোটা হয়ে যায় ৷ তবে প্রসাধন এবং সাজ-সজ্জায় রেশ থেকে যায় ৷ এই থেকে সহজেই বলা যায় মহিলা আগে নাচতেন ৷
ফেরার পথে কিছুক্ষণ চলে গেলাম নিজের কৈশোরের দিনগুলিতে ৷ পড়াশুনা করেছি ছেলেদের স্কুলে ৷ কোনোদিন প্রাইভেট টিউটরের কাছে যাইনি ৷ ফলে মাধ্যমিক এবং তার পরে অনেকটা সময় অবধি কেটেছে অদ্ভুত এক রক্ষণশীলতার গণ্ডিতে ৷ অলিখিত ব্রহ্মচর্যে ৷ সেখানে কোন মেয়ে বন্ধু নেই ৷ শুধু সুবর্ণাদের বড়িতে গেলে গুমোট হাওয়া কিছুক্ষণের জন্য কেটে যেত ৷ আমি গেলে মাসিমা সুবর্ণার হাতে জলখাবার পাঠাতেন ৷ অনেক সময় ওর দাদা থাকত না ৷ আমাকে বসতে বলত ৷ আমি পড়াশুনায় খারাপ ছিলাম না ৷ বরঞ্চ সুবর্ণার দাদা আমায় ডাকত ৷ দু`জনে মিলে পড়লে অনেকটা এগিয়ে যেত ৷ অনেক গল্পও করতাম ৷ আমাদের পাঠ্যক্রমে ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘কথা ও কাহিনী’ কাব্যগ্রন্থ ৷ কবিতাগুলি আবৃত্তি করতাম ৷
‘কথা কও , কথা কও ।
অনাদি অতীত , অনন্ত রাতে
কেন বসে চেয়ে রও ?
কথা কও , কথা কও ৷’
স্মৃতির রোমন্থন অতীত সম্পর্কে জানার আগ্রহ বৃদ্ধি করে ৷ আজকাল তাই সুযোগ পেলে ত্রিপুরা নিয়ে ইতিহাস পড়ি ৷ গাড়িতে আসতে আসতে ঐতিহাসিক স্থানগুলির রোমন্থনে মত্ত হলাম ৷ বড়মুড়া ইকো-পার্ক তেলিয়ামুড়া থানার অন্তর্গত ৷ এই অঞ্চলের জুমে একসময় প্রচুর তিল চাষ হত ৷ এখানে তেলি সম্প্রদায়ের লোক বাস করত ৷ যাদের পেশাই ছিল ঘানি পিষে তৈল উৎপাদন ৷ মতান্তরে কালো রং-এর লাল ঠোঁটযুক্তা একধরণের পাখির নাম ককবরকে ‘তিলিয়া’ ৷ পাখিগুলিকে চড়ুইয়ের ছোটভাই এবং টুনটুনির মেজভাই বলা যেতে পারে ৷ ‘তিলিয়া’ থেকে তেলিয়ামুড়া নামটি এসেছে ৷দুই পাহাড়ের মধ্যে তেলিয়ামুড়া অঞ্চলের গড়ন অনেকটা তেলের প্রদীপের চাটার মত ৷
বড়মুড়া পাহাড় থেকেই উৎপত্তি হাওড়া নদীর ৷ নদীটির আরেক নাম ‘সাইদরা’ ৷ হাওড়া এখন শুকিয়ে যাচ্ছে ৷ বনবিভাগ থেকে থেকে স্থানে স্থানে সাইনবোর্ড লাগিয়ে রাখা হয়েছে ৷ সাইদরার উৎস এলাকায় বন রক্ষার জন্য ৷ একসময় এই নদী খুবই প্রাণবন্ত ছিল ৷ আগে নদীটি কলেজটিলা ওয়াটার সাপ্লাইয়ের কাছ থেকে শিব-নগর শান্তিপাড়া হয়ে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হত ৷ রবীন্দ্রনাথ প্রথম ত্রিপুরায় আসেন জলপথে ৷ বর্তমান বাংলাদেশের মোগরা স্টেশন থেকে ৷ তখন রাধাকিশোর মাণিক্য বাহাদুরের রাজত্বকাল ৷ কবিগুরুকে হাওড়া নদীর শান্তিপাড়ার ঘাটে যুবরাজ বীরেন্দ্রকিশোর বরণ করেছিলেন ৷ শোভাযাত্রা সহকারে তাঁকে কর্নেল বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় ৷ রাজা বীরেন্দ্রকিশোর হাওড়া নদীর গতিপথ প্রথম ঘুরিয়ে দেন ৷ কলেজটিলা ও জগহরিমুড়াকে আগরতলা শহরের ভেতর নিয়ে আসেন ৷ তখন কলেজটিলার নাম ছিল রসমনটিলা ৷ রসমোহন ঠাকুরের নামে ৷ অনেকে বলত বিদ্যাপত্তন টিলা ৷
পাহাড় পেরিয়ে প্রথম জনপদ চম্পকনগর ৷ নামটি এসেছে গাছের নাম থেকে ৷ চম্পকনগরে এখনো প্রচুর চাঁপাফুল গাছ দেখা যায় ৷ জিরানীয়া শব্দটি এসেছে ‘জিরান’ শব্দটি থেকে ৷ তখন রাজ দরবার বসত পুরাতন হাবেলিতে ৷ পুরাতন আগরতলায় ৷ রাজার সাথে দেখা করতে এসে প্রজারা এখানে জিরাত বা বিশ্রাম নিত ৷ ঐতিহাসিক প্রবাল বর্মনের মতে ‘জিরান’ শব্দটি নিয়ে এসেছে বাংলাভাষী এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী ভাষী মানুষেরা ৷ স্থানটির ককবরক নাম ছিল জিরায় লৌঙ বা জরাইলুং ৷ স্বর্ণ-লতিকা বা এক ধরনের পরগাছা, যা এই অঞ্চলর গাছে প্রচুর দেখা যেত ৷
এর পরের জনপদ রানির বাজার ৷ রাজা রাধাকিশোর মাণিক্যের মধ্যম রানি তুলসীবতীর নামে ৷ তুলসীবতীর জন্ম পাশের নলগড়িয়ায় ৷ এক মনিপুরী ক্ষত্রিয় পরিবারে ৷ তাঁর ছোটবোন মনমঞ্জরীও রাধাকিশোর মাণিক্যের রানি ছিলেন ৷ রানি তুলসীবতীর মাসোয়ারার জন্য রাজা একটি তালুকের বন্দোবস্ত করেন ৷ দূরবর্তী পার্বত্য প্রজাদের সুবিধার কথা ভেবে রানি এখানে বাজারের পত্তন করেন ৷ কথিত আছে এই বাজারের আয় থেকে তিনি ১৮৯৩ সালে মহারানী তুলসীবতী স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন ৷
এরপর আসে ঘোড়ামারা ৷ রাজকুমার সমরেন্দ্র দেববর্মা ছিলেন কিছুটা বদরাগী ৷ কথিত আছে, তিনি একবার বেশকিছু সঙ্গীসহ রানীরবাজার থেকে পুরাতন হাবেলিতে আসছিলেন ৷ ঘোড়াতে করে ৷ অন্যদের ঘোড়া ছোট্ট নদীটি অতিক্রম করে গেল অবলীলায় ৷ কিন্তু তাঁর ঘোড়া কিছুতেই জলে নামবে না ৷ রাগে তিনি ঘোড়াটিকে গুলি করে মেরে ফেললেন ৷ সেই থেকে স্থানটির নাম ঘোড়ামারা ৷
রেশমবাগানের পত্তন রাজা রাধাকিশোর মাণিক্যের সময়ে ৷ তিনি ত্রিপুরায় রেশম শিল্পের প্রসারে উদ্যোগী হয়েছিলেন ৷ এইজন্য এক কৃষিবিদ যোগেশচন্দ্র চৌধুরীকে জাপানে পাঠিয়েছিলেন প্রশিক্ষণের জন্য ৷ যোগেশচন্দ্র চৌধুরীর চেষ্টায় এখানে একটি রেশম উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে উঠে ৷ সেটি এখন কালের গহ্বরে চলে গেছে ৷ শুধু রয়ে গেছে নামটি ৷
আমি মূলত ইতিহাসবিদ খগেশ দেববর্মন এবং প্রবাল বর্মনের বই পড়েছি ৷ তাঁদের লেখায় ফুটে উঠেছে মনিপুরী কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রতি ত্রিপুরার রাজাদের আগ্রহ ৷ রাজা ঈশান চন্দ্র মাণিক্য, বীরচন্দ্রমানিক্য, রাধাকিশোর মাণিক্য, বীরেন্দ্রকিশোর মাণিক্য প্রত্যেকেই এক বা একাধিক মনিপুরী কন্যাকে রাজপত্নী হিসাবে গ্রহণ করেছেন ৷ কুঞ্জবন নামটি এসেছে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে ৷ মঠ চৌমুহনীর মঠটি স্থাপন করেছিলেন রাজা বীরচন্দ্রের রানি মনমোহিনী দেবী ৷ তাঁর পিতার শ্মশানের উপর ৷ এর ঠিক পাশেই রয়েছে ‘লাইনিং থৌ পাখাংবাগী লাইফমানি’ মন্দির ৷ মন্দিরটি স্থাপন করেন রাজা বীরচন্দ্রমানিক্যের রানি রাজ্যেশ্বরী ৷ আমার মত অ-মনিপুরীরা মন্দিরটিকে পাগলা দেবতার মন্দির বলে চেনে ৷
নন্দননগরে ফিরে আসতে বিকেল তিনটে গড়িয়ে গিয়েছিল ৷

Wednesday, 13 January 2016

কৈশোরের বিপথগামিতা


কৈশোরের বিপথগামিতা

ভূমিকা : আমার অফিসের একটি উপজাতি ছেলে ৷ চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ৷ বেশ চটপটে ৷ খুবই কর্মঠ ৷ কিন্তু সরল ৷  বাড়ি চম্পকনগর ৷ গত বছরের ঘটনা ৷ সে বাড়িতে প্রচুর সবজি ফলিয়েছে ৷ বিশেষ করে করলা ৷ খুব বড় বড় আকারের ৷ উদ্বৃত্ত সবজি বাজারে বিক্রি করে কিছু পয়সাও পাচ্ছিল ৷ একদিন আবিষ্কার করল কে বা কাহারা তার করলা চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে ৷ পাড়ার লোকজনের কথায় প্রতিবেশী একটি কিশোরের উপর সন্দেহ হল ৷ ওর ঘরে একই আকৃতির কিছু করলাও দেখতে পেল ৷ কথায় কথায় ছেলেটির অভিভাবকের কাছে তার বাগান থেকে করলা চুরির প্রসঙ্গ তুলল ৷ কিন্তু প্রতিবেশী স্বীকার করল না ৷ বলল বাজার থেকে কিনে এনেছে ৷ হয়তো লোকটি সত্যি কথা বলছে ৷ হয়তো সে ছেলের চৌর্যবৃত্তিকে আড়াল করে রেখেছে ৷
     
            আমাদের দেশে শিশুর জন্মকে স্বর্গের দান হিসাবে মানা হয় ৷ আর এই সন্তান যদি ছেলে হয়, পরিবারে আনন্দের সীমা-পরিসীমা থাকে না ৷ ছোটবেলা থেকে সে অতিরিক্ত আদর-যত্ন পেয়ে আসে ৷ অনেক সময় এই আদরের আতিশয্যে ছেলেটি কোন অপরাধ করলে অভিভাবকরা শাসন করতে ভুলে যান ৷ শেষ জীবনে এই পিতা-মাতাই আক্ষেপ করেন, ‘ছোটবেলায় শাসন করনি না ব্যথা পাবে বলে, আর বড় হওয়ার পর শাসন করিনা আমার কানে ধরবে বলে ৷
     
      এ`ভাবেই সাধারণত শুরু হয় কৈশোরের বিপথগামিতা ৷ পরে অন্যসব কারণগুলি, একে একে যুক্ত হয় ৷ আইনের পরিভাষায় ৭ থেকে ১৮ বছরের কোন কিশোর কিংবা কিশোরী যদি আইন ভঙ্গ করে, তবে তাকে বিপথগামী কিশোর বা কিশোরী আখ্যায়িত করা হয় ৷ সম্প্রতি আইন সংশোধন করে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, ইত্যাদি জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ১৬ বছরে কমিয়ে আনা হয়েছে ৷ দেখা যায়, এই সব কিশোর-কিশোরীরা জড়িয়ে পড়ে মার-পিট থেকে শুরু করে ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, অপহরণ, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, প্রভৃতি জঘন্য অপরাধে৷
     
পরিসংখ্যান : ভারত সরকারের গৃহ-মন্ত্রকের অধীন ব্যুরো অফ পুলিস রিচার্স এন্ড ট্রেনিং বা বি. পি. আর. এন্ড ডি. প্রতিবছরের শেষ দিকে আগের বছরে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অপরাধের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ বের করে ৷ গত বছরের অর্থাৎ 2015 সালের অপরাধের পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ পায় নি ৷ তাই 2014 সাল অবধি ঘটে যাওয়া কৈশোরের বিপথগামিতার কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরছি :


সারণী- এক
বছর ভিত্তিক ঘটনা
বছর

কৈশোরের বিপথগামিতা

দেশের সর্বমোট অপরাধ

শতকরা হিসেবে কৈশোরের বিপথগামিতা


প্রতি লক্ষ জনসংখ্যার হিসাবে কৈশোরের বিপথগামিতা

2010
22740
2224931
1.0
1.9
2011
25125
2325575
1.1
2.1
2012
27936
2387188
1.2
2.3
2013
31725
2647722
1.2
2.6
2014
33526
2851563
1.2
2.7

সারণী - দুই
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কৈশোরের বিপথগামিতা 2014 সালে
সালে
রাজ্য
অরুনাচল
আসাম
মনিপুর  
মেঘালয় 
মিজোরাম 
নাগাল্যান্ড 
সিকিম 
ত্রিপুরা
সর্বমোট ঘটনা
77
466
20
120
44
09
19
64


সারণী- তিন
অপরাধের ধারা অনুযায়ী কৈশোরের বিপথগামিতা
ক্রমিক সংখ্যা
অপরাধ
2010
2011
2012
2013
2014







1
খুন
679
888
990
1007
841
2
প্রাণনাশের চেষ্টা
543
642
580
825
728
3
ধর্ষণ
858
1149
1175
1884
1989
4
অপহরণ
524
760
789
1121
1455
5
ডাকাতি
97
134
174
160
182
6
রাহাজানি
551
639
767
904
1024
7
চুরি
4930
5320
5528
6386
6717
8
শ্লীলতাহানি
546
573
613
1424
1591
9
অন্যান্য
14012
15024
17320
18014
18999
10
মোট 
22740
25125
27936
31725
33526

      এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র পুলিশ ধর্তব্য বা কগনিজিবল অপরাধের উপর ভিত্তি করে ৷ 2014 সালের 33526 টি এইসব ঘটনায় মোট 48230 জন কিশোর-কিশোরী গ্রেপ্তার হয় ৷ এরমধ্যে ষোল বছরের ঊর্ধ্বে এবং আঠার বছরের নিচে 36138 জন ৷ যার মধ্যে কিশোর 34941 জন এবং কিশোরী 1197 জন ৷বার বছরের ঊর্ধ্বে এবং ষোল বছরের নিচে 11220 জন ৷ যার মধ্যে কিশোর 10906 জন এবং কিশোরী 314 জন ৷ বার বছরের নিচে 872 জন ৷ যার মধ্যে কিশোর 791 জন এবং কিশোরী 81 জন ৷ শিক্ষাগত দিক থেকে নিরক্ষর 10530 জন, প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত 15004 জন, মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত 17637 এবং উচ্চ-মাধ্যমিক বা তার উপর পর্যন্ত 5059 জন৷ত্রিপরাতে 64 টি ঘটনায় 78 জন গ্রেপ্তার হয়েছে ৷ যার মধ্যে নিরক্ষর 22 জন, প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত 30 জন এবং মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত 26 জন ৷ এদের মধ্যে মা-বাবার সাথে থাকে 38693 জন, অভিভাবকের সাথে থাকে 7905 জন এবং গৃহহীন 1632 জন ৷

      কারণ : কৈশোরের বিপথগামিতার কারণ খোঁজার আগে, সাম্প্রতিক অতীতের একটি ঘটনার উল্লেখ করছি ৷ গৌহাটিতে বার বছরের একটি কিশোরী ধর্ষিতা হয় ৷ পাঁচ-জন ছলের দ্বারা ৷ ছেলেগুলিকে গ্রেপ্তারের পর দেখা গেল সবকয়টি ছলেই নাবালক ৷ আর দিল্লীর নির্ভয়া কান্ডতো আমাদের সমাজের সকল অংশের মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে ৷ যার ফল-স্বরূপ এই সংক্রান্ত আইনের সাম্প্রতিক সংশোধন ৷কিন্তু এইসব ঘটনা ডুবন্ত হিম-শৈলের শুধু চুড়াটুকুর আভাষ দিচ্ছে ৷ বলার অপেক্ষা রাখেনা আমাদের দেশে কৈশোরের বিপথগামিতার কারণে প্রতিদিন অসংখ্য ঘটনা ঘটছে ৷এবারে কৈশোরের বিপথগামিতার কারণগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক ৷
(ক)  পরিবার : গবেষণায় দেখা গেছে যে-সব পরিবারে পিতা-মাতা কিংবা অন্য সদস্যদের সাথে ঝগড়া বিরাজ করে ৷ অনেক সময় পিতা-মাতার মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটতেও দেখা যায় ৷ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে এইসব পরিবর থেকে 13.3% ছেলে-মেয়ে বিপথগামিতার শিকার হয় ৷

(খ)  সঙ্গদোষ : কৈশোরে ছেলে-মেয়েদের কাছে সমবয়সীদের সহচর্য বাবা-মা, আত্মীয় পরিজনদের চেয়ে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য ঠেকে ৷ বন্ধু-বান্ধবের বিপথগামিতা, মাদক ও নেশা সামগ্রীর প্রতি আসক্তি ক্রমে সংক্রামিত হয় ৷ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে সঙ্গদোষের কারণে 23% ছেলে-মেয়ে বিপথগামিতার শিকার হয় ৷

(গ) স্থান : যে-কোন এলাকার আইন-শৃঙ্খলার পরিস্থিতি প্রতিটি কিশোর-কিশোরীর উপর রেখাপাত করে ৷ এলাকাটি অপরাধ-প্রবণ হলে কিশোর-কিশোরীদের বিপথগামী হবার প্রবণতা বেশি থাকে ৷

(ঘ)  দারিদ্র :  কৈশোরের বিপথগামিতার একটি বড় কারণ হচ্ছে দারিদ্র্য এবং সমাজ ব্যবস্থা ৷ দারিদ্রের কারণে আমাদের দেশের অনেক শিশুরই শৈশব এবং কৈশোর ফুটপাতে কিংবা অনগ্রসর বস্তিতে কাটে ৷ সেখানে থাকেনা কোনও খেলাধুলা ও আমোদ-প্রমোদের সুযোগ ৷ পাশাপাশি ধনী ঘরের ছেলে-মেয়েরা সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে ৷ ধনের এই বৈষম্য কিশোর-কিশোরীদের বিপথগামী হতে উৎসাহিত করে ৷

(ঙ)  রাজনীতি : আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন অপরাধে অপরাধী ৷ এইসব দুর্নীতিগ্রস্থ রাজনীতিবিদেরা এবং কিছু সংখ্যক ব্যবসায়ী প্রায়শই মদ, জুয়া, ভিক্ষাবৃত্তি, পতিতাবৃত্তি, প্রভৃতি অসামাজিক কাজ চালায় ৷ কিশোর-কিশোরীরা তাদের খপ্পরে পড়ে বিপথগামিতার শিকার হয় ৷মজার বিষয় হচ্ছে সিনেমাতেও আমরা একে উপজীব্য হিসাবে দেখি এবং এইসব বিপথগামী চরিত্রকে নায়ক হিসাবে মানি ৷

(চ)  শিক্ষা : যদিও স্কুল কলেজের পুঁথিগত শিক্ষা একটি কিশোর-কিশোরীকে সু-নাগরিক হতে সাহায্য করে, তথাপি স্কুল-কলেজ থেকেই ছাত্র-ছাত্রীরা বিপথগামী হয় ৷ সব বাচ্চারা সমান মেধার হয় না ৷ বুধ্যাঙ্ক বা আই. কিউ. ভিন্ন হয় ৷ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে বাড়িতে বকুনি মেলে ৷ অনেক ক্ষেত্রে বাচ্চারা দৈহিকভাবে নিগৃহীতও হয় ৷ কৈশোরের এই শাসন বাচ্চাদেরকে অনেক ক্ষেত্রে বিপথগামী করে ৷ প্রসঙ্গক্রমে দুধে জল মেশালে যে লাভ হয়, তা আমরা অংক করতে গিয়েই শিখি ৷ এক পরিসংখ্যানে দেখ গেছে 80 থেকে 85 মধ্যে বুধ্যাঙ্কযুক্ত বাচ্চারা বিপথগামিতার শিকর হয় ৷ সাধারণ বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বুধ্যাঙ্ক 100 এর কাছাকাছি থাকে ৷

উপসংহার  : কৈশোরর বিপথগামিতার রোধে আমরা নিম্নোক্ত পন্থা গ্রহণ করা কাম্য :
(ক)  একটি কিশোর-কিশোরীকে তার নিজস্ব ব্যক্তিসত্তা নিয়ে বাঁচতে দিতে হবে ৷ তাকে দিতে হবে আদর, ভালোবাসা ও সামাজিক নিরাপত্তা ৷

(খ)  ছোটবেলা থেকেই কোনো শিশুর বুধ্যাঙ্ক কম নজরে এলে কিংবা অসংলগ্নতা লক্ষ্য করলে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে হবে ৷ জীবনের শুরুতে চিকিৎসা করালে হয়তো শিশুটিকে বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষা করা যাবে ৷
(গ)  প্রতিটি শিশুকে সংগীত, নাচ, চিত্রকলা, খেলাধুলা, ইত্যাদির সুযোগ দিতে হবে ৷

(ঘ)  প্রচেষ্টা নিতে হবে ছোটবেলা থেকে নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধে শিক্ষিত করে তুলতে ৷

(ঙ)  বিপথগামিতাকে ত্যাগ করুন, বিপথগামীকে নয় ৷

(চ)  কোনো অসামাজিক কাজ করে থাকলে শিশুটিকে তা স্বীকার করতে উৎসাহিত করুন ৷

(ছ)  বাড়িঘর, স্কুল, এবং সমাজে একটি শিশুকে বিপথগামী করার মত পরিবেশ বিরাজ করলে,  তা পাল্টাবার চেষ্টা করুন ৷

(জ)  কোনো কিশোর-কিশোরীর মধ্যে বিপথগামিতার লক্ষ্য দেখ গেলে, তাকে একটা দায়িত্ব দিন ৷ যেমন, অন্য শিশুদের বিপথগামী হওয়া থেকে রক্ষ করে ৷ এই দায়িত্ববোধ হয়তো তার মধ্যে পরিবর্তন নিয়ে আসবে ৷ অবশ্য তার কাজ-কর্মে নজর রাখতে হবে ৷

(ঝ)  যদি কোনও কিশোর-কিশোরীর মধ্যে বিপথগামিতা নজরে আসে, তা চেপে যাবেন না ৷ এজন্য তাকে শাস্তি পেতে দিন ৷তবে নজর রাখতে হবে এই শাস্তি যেন গুরুতর না হয় ৷

(ঞ)       শিশুর বিপথগামী হওয়ার মত পারি-পার্শ্বিক উপাদান সামলে রাখুন ৷

(ট)        শিশু-শ্রম একটি শিশুকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তাকে তার প্রাপ্য শিক্ষা প্রদান করুন ৷

            ইতি টানার আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে একটি গল্পের উল্লেখ করছি ৷ অনেক আগে পড়েছিলাম ৷ একটি ছোট ছেলের গুরুদেবের বাড়িতে যাতায়ত ছিল ৷ সে একদিন গুরুদেবের একটি কলম চুরি করল ৷ বন্ধুরা তার কাছে কলমটি দেখলে সে বলল গুরুদেব তাকে কলমটি দিয়েছেন ৷ অন্য বন্ধুরা একটু আশাহত হল ৷ তারা একদিন কবিগুরুকে তার নাম উল্লেখ করে বলল, ‘আপনি, তাকে কলম দিয়েছেন ! কই আমাদেরতো কখনো কিছু দেন না ?’

এই কথা শোনে গুরুদেব অবাক হয়ে বললেন, ‘এইজন্যই কয়েক দিন যাবত আমি কলমটি পাচ্ছি না ৷ সে-ও এদিকে আসছে না ৷
      ছেলেরা বলল তাকে ধরে নিয়ে আসি ৷ রবীন্দ্রনাথ এবার তাদের নিষেধ করে বললেন, ‘ওকে অন্তর্দহনে দগ্ধ হতে দাও, অন্যথায় সে দাগী হয়ে যাবে ৷
      ক্ষেত্রবিশষে অন্যায় সহন করতে হয় ৷