Wednesday, 28 February 2018

ওয়ার্ড নং 6



ছোটবেলায় মেঘনাদবাবুর একটি নেশা ছিল বিদেশী গল্পের অনুবাদ পড়া `ভাবে প্রচুর গল্প উপন্যাস পড়েছেন দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো অনেক গল্পই তাঁর মনে আসে বিশেষত জুলে ভার্নের গল্পগুলি কিন্তু একটি গল্প নিজস্ব স্বকীয়তায় তাঁর মনে এখনো ভাস্বর ছোটবেলা থেকে মাঝ বয়স পেরিয়ে এসেও মনে হয় এন্টন চেকভের ওয়ার্ড নং 6, তাঁর পড়া শ্রেষ্ঠ গল্প ডাঃ আন্দ্রে রাগিন একটি মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ইন-চার্জ হিসাবে যোগ দেওয়ার পর গল্পের প্রবাহ শুরু হয় ইভান গ্রোমভ সেই পাগলা গারদের রোগী ওয়ার্ড নং 6-এর আবাসিক একটি ছোট ঘর ইভান গ্রোমভের সাথে আরো চারজন রোগী ঘরের ভিতর এবং স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভীষণ অব্যবস্থা এই নিয়েই আন্দ্রে রাগিন গ্রোমভের মধ্যে দিনের পর দিন আলাপচারিতা চলে গ্রোমভের মনে হয় এই পরিবেশে থাকা থেকে মৃত্যুদণ্ডও ভালো তাঁরা যাবজ্জীবন সাজা মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে তুল্যমূল্য বিচার করেন গল্পের শেষ পর্যায়ে ডাঃ আন্দ্রে রাগিন নিজেই মানসিক রোগী হয়ে পড়েন এবং মারা যান

মেঘনাদবাবু আগরতলায় মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের 6 নং ওয়ার্ডের আবাসিক সত্যি কথা বলতে কি, তাঁর ঘরের নাকের ডগায় এম সি- 6 নং ওয়ার্ডের অফিস তাই চেকভের গল্প তাঁর প্রতিনিয়ত মনে আসে ফ্রয়েডের মতে প্রতিটি মানুষের মধ্যে জন্ম থেকে কিছু পাগলামো থাকে তাঁর কথায় ছোটবেলার সবকিছু ইচ্ছা এবং আচরণই যৌনতা ভিত্তিক ফ্রয়েড এই যৌন প্রবৃত্তিকে নাম দিয়েছেন লিবিডো বা কামপ্রবৃত্তি তাঁর তত্ত্বের নাম ঈডিপাস কমপ্লেক্স মেঘনাদবাবু ঠিক করেছেন গল্পটি আবার পড়বেন কোন ছোটবেলায় পড়েছিলেন ! একটু সংশয়, আগের মত ভালো লাগবে কি না গল্পটি নাকি রাত্রিতে পড়তে নেই

ত্রিপুরা মেঘনাদবাবুর কাছে মিনি ইন্ডিয়া মনে হয় কারণ এই রাজ্যে স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি ভারতবর্ষের প্রায় প্রতিটি রাজ্যের লোকজনেরই দেখা মেলে সব ধর্মের, সব বর্ণের, সব রাজনৈতিক ভাব-ধারার লোকজনের দেখা মেলে আর `টা সম্ভব হয়েছে ত্রিপুরা রাজ্য রাইফেলসের এক চতুর্থাংশ লোক বাইরের রাজ্য থেকে নিয়োগ হওয়ার সুবাদেও বিস্ময়কর ভাবে মেঘনাদবাবু তাঁর ওয়ার্ড এলাকায় একই বৈচিত্র্যের প্রতিফলন দেখতে পান হিন্দু, মুসলিম, খ্রিষ্টান, শিখ প্রায় সব ধর্মের লোকের পাশাপাশি জাতি-জনজাতি, মনিপুরী সবাই আছে এখানে সরকারী স্কুল, কনভেন্ট স্কুল এর পাশাপাশি মাদ্রাসাও বিরাজমান মন্দির-মসজিদ-গির্জাও আছে কিন্তু তবু মনে হয় বেশ অব্যবস্থা সারাদিন স্ট্রিট লাইট জ্বলে থাকে কোথাও পরিস্রুত জল গড়িয়ে পড়ছে রাস্তা ঠিক করার পরই কাটার কথা মনে হয় নাগরিকতার অসুখ আমরা নাগরিকরা সচেতন নই

ওয়ার্ড নং 6 নির্বাচনের বুথ অফিসও বটে পাঁচজন প্রার্থী সবাই পরিচিত তিনজনের সাথে মেঘনাদবাবুর দেখা হয়েছে তিনজনকেই তিনি শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তিনজনই জয়ের বিষয়ে প্রচণ্ড আশাবাদী একজনতো টি ভি সাক্ষাৎকারে বলেছেন বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন রাজনীতিবিদদের এই আত্মবিশ্বাস দেখে মেঘনাদবাবু পুলকিত হন ঠিক যেন ভারতের অন্ধ ক্রিকেট সমর্থক অনেকগুলি উইকেট হারিয়ে দলের হাল যখন বিপর্যস্ত, তখনও অনেকে ভাবে শেষ দিকের ব্যাটসম্যানরা চমৎকার করবে মেঘনাদবাবু নিশ্চিত যে এঁদের কয়েকজনের জামানত জব্দ হবে তবুও পাগলপনা
নির্বাচনের আগের দিন এলো পাঞ্জাব পুলিশের একটি দল সাথে `জন ভোট-কর্মী বিকেল থেকেই উৎসাহী জনতা ভিড় জমাল ভিড় সামাল দিতে দৌড়ে এলো আধা-সামরিক বাহিনীর লোকজন স্থানীয় থানার বড়বাবু সবাই হুড়োহুড়ি করে সরে পরল অমিতবাবু বললেন, ‘খাইছে, হাতিমারা ফোর্স !’

সবাই হেসে উঠলঅমিত দেব পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত সাব-ইন্সপেক্টর আধা-সামরিক বাহিনীর লোকদের সাথে অনেক ডিউটি করেছেন ফৌজের লোকেরা চলে গেলে বললেন, ‘ওদের গল্পই সার! হাতি মেরেছি ঘোড়া মেরেছি মনু থানায় চাকুরী করার সময় একবার রাত্রিতে বৈরী বিরোধী অভিযানে বেরিয়েছিলাম গন্তব্য চিচিংছড়া সাথে হাতিমারা ফোর্স ! যাওয়ার পথে ধুপুর-ধাপুর সবাই আছাড় খাচ্ছিল বার বার নিষেধ করা সত্ত্বেও টর্চ জ্বালছিল ফল যা হবার তাই বৈরীরা নির্বিবাদে সরে পড়ল

সবাই আবার একপ্রস্ত হাসল ভোটের দিন নির্বিবাদে কাটল ভি এম- ঠিক-ঠাক কাজ করলো ভোটের হারে সবাই খুশি কিন্তু টেন্সড কেউ হারতে রাজি নয় শুধু সকালে একপ্রস্ত হাসির রোল উঠেছিল রোজকার মত বদ্রু তার গরু কাজলিকে স্নান করিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ফিরোজ চাচা ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি মন্তব্য করলেন, ‘কিতা বদ্রু, কাজলিরেও ভোট দেওয়াই-বানি ?’
বদ্রুও কম যায় না বলল, ‘ইচ্ছা আছিল কিন্তু এবার ভোটার লিস্টে কাজলির নাম ওঠে নাই! কাজলির আধার কার্ডও নাই ।’