Sunday, 24 May 2015

এক সফর, মহাভারত থেকে ভারতে


()
বৈশাখের দাবদাহ আমি অনেক দেখেছি কিন্তু এবারের মত দুঃসহ গরম আমি কখনও অনুভব করিনি ২০০৮ সাল আমি পঞ্চম বাহিনী ত্রিপুরা রাজ্য রাইফেলস অর্থাৎ টি.এস.আরে কর্মরত ডাক্তার রাজ্যে আমরা গড়ে দুশোর বেশী বৃষ্টিস্নাত দিন দেখতে পাই ত্রিপুরার মত রাজ্যকেও সেবার খরা-কবলিত ঘোষণার তোরজোড় চলছিল আমাদের বাহিনীর সদর ডলুমা, অমরপুরে আমাদের প্রাত্যহিক আলোচনায় ঘুরেফিরে আসত আর কতদিন প্রকৃতির এই কঠোরতা চলবে? পরিস্থিতিকে আরও দূরহ করে তুলেছিল ম্যালেরিয়া আন্ত্রিক রোগ আমাদের জওয়ানেরা কাতারে কাতারে ম্যালেরিয়া জীবাণু প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিফ্যারাম জলবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে বাহিনীর সদরে চিকিৎসার জন্য আসত আমাদের ক্যাম্পগুলি ছিল কালাঝারি পাহার এবং বড়মুড়া-দেবতা-মুড়া পাহার শ্রেণীর উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রশাসনিক বিচারে অমরপুর, গন্ডাছড়া এবং সাব্রুম এই তিন মহকুমার শান্তিকামী লোকজনদের ভরসা এই ব্যস্ততার মধ্যে ১৭ই এপ্রিল ২০০৮ ইং তারিখে আমি একটি খামে-বদ্ধ আদেশ পাই আমার অধিকর্তার অফিস থেকে আমাকে রাজ্যের বাইরে যেতে হবে টি.এস.আরে লোক নিয়োগের জন্য গঠিত বোর্ডের সাথে এখানে বলা প্রয়োজন যে টি.এস.আর. জওয়ানদের একটা অংশ রাজ্যের বাইরের যুবকদের থেকে পূরণ করা হয়
এই আদেশ পেয়ে আমার মন খারাপ হয়ে যায় এই কঠিন দাবদাহের মধ্যে গাড়িতে এতটা পথ সফর করতে হবে ভাবতেই কষ্ট হচ্ছিল আমরা যাব প্রথমে উত্তর-পশ্চিম ভারতের পাজ্ঞাব তারপর উত্তরের দেরাদুন হয়ে মাওবাদী অধ্যুষিত ঝাড়খণ্ড-বিহার-উড়িষ্যা অতঃপর দেশের পূর্ব-তট ধরে বিশাখা-পত্তনম, নেল্লোর সবশেষে উত্তর-বঙ্গের শিলিগুড়ি সব মিলিয়ে পারি দিতে হবে ত্রিপুরা থেকে প্রায় দশ হাজার কিলোমিটার টি.এস.আরের চাকুরীর জন্য জারি করা সরকারী নির্ঘণ্টে দেখতে পেলাম ৪৫ দিনের সফর-নামা বাস্তবে তা পালন করা যাবে কি না আমার সন্দেহ হল চাকুরীতে নিয়োগ-প্রক্রিয়ার জন্য বেছে নেওয়া প্রতিটি স্থানে হাজারে হাজারে লোক সমাগম হবে যার মধ্যে থাকবে চাকুরী প্রত্যাশী যুবকরা তাদের আত্মীয়-স্বজন এবং অসংখ্য ঠগ-জুচ্চুরি আমার কাছে কাজটি সত্যি পাহাড়-প্রমাণ মনে হল সুতরাং এই দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেতে আমি চেষ্টার কোন কসুর বাকি রাখলাম না কিন্তু আমাদের দপ্তরের প্রবীণরা আমাকে উপদেশ দিলেন বোর্ডের সাথে যেতে তখন আমারও মনে হল ভারতে এই দুঃসহ গরমে দশ-হাজার কিলোমিটার গাড়িতে সফর, বিরল এক অভিজ্ঞতা হবে বোর্ডের সদস্যরাও আমাকে উৎসাহিত করলেন আশ্বাস দিলেন সবরকম সহযোগিতার
আমি তদের উৎসাহের কারণ খোঁজার চেষ্টা করলাম কিন্তু কোন সূত্র পেলাম না এদিকে আমার অধিকর্তাও এই দায়িত্ব থেকে মুক্তির জন্য দাখিল করা আমার আবেদন না-মঞ্জুর করে দিলেন এই অবস্থায় টি.এস.আরে লোক নিয়োগের জন্য গঠিত বোর্ডের সাথে যাওয়া ছাড়া আমার কাছে কোন বিকল্প পথ রইল না৷
    সৌভাগ্যবশত: নিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য নিযুক্ত বোর্ডের মুখ্য-অধিকর্তা ছিলেন আমার পরিচিত শ্রী অম্বুজনাভ শর্ম্মার জন্ম আমাদেরই গ্রামে তাই আমাদের ছোটবেলা কেটেছে একই মহকুমা শহরে পড়াশুনা একই স্কুলে যদিও বয়সে তিনি আমার চেয়ে অনেকটা বড় তিনি কলা-বিভাগের স্নাতক আর আমি ডাক্তারিতে পরে তিনি ইতিহাসে এম.. পাস করেন কিছুদিন একটি কলেজে চাকুরী করে নিয়োগ সেবা আয়োগের পরীক্ষা দিয়ে পুলিশ সেবায় যোগ দেন উপ-পুলিশ সুপার হিসাবে পনের বছরের উপর পুলিশ বিভাগের বিভিন্ন পদে চাকুরী করে বর্তমানে তিনি একটি টি.এস.আর বাহিনীর প্রধান
এই ভর্তির দলে আরও দুজন কার্যকরী সদস্য ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শ্রী কৌশিক রায় এবং শ্রী অজিত দেববর্মা শ্রী দেববর্মা একটি টি.এস.আর বাহিনীর সহকারী সমাহর্তা এই দু`জনের কেউই আমার পূর্ব পরিচিত নন দলের অন্য ষোল জন সদস্যও ছিলেন আমার অপরিচিত এদের মধ্যে পুলিশের ইন্সপেক্টর থেকে শুরু করে ড্রাইভার, সিপাই, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী পর্যন্ত বিভিন্ন পদমর্যাদার লোক ছিল
শর্ম্মা সাহেব ২৩ শে এপ্রিল ২০০৮ ইং তারিখে একটি বৈঠক নিলেন প্রস্তুতি যাচাইয়ের এই মিটিং- আমিও হাজির ছিলাম বোর্ডের সদস্যরা এবং দলের সহযোগী সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন দীর্ঘক্ষণ বৈঠকের পর নিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হল এই তালিকায় আলপিন থেকে শুরু করে শারীরিক পরীক্ষার যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, ফ্লেক্সের পোস্টার প্রভৃতি প্রায় ১৫০ টি সামগ্রী স্থান পেয়েছিল এইসব কর্মকাণ্ড দেখে আমার মনে হল এযে অশ্বমেধ যজ্ঞ আমি মনে মনে উৎসাহিত বোধ করলাম তখন পর্যন্ত আমার প্লেনের টিকিট কাটা হয় নি শর্ম্মা স্যার প্রার্থীদের ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য অন্য উপায়ের কথা ভাবছিলেন বোর্ডে আমার যোগ দেবার অনিশ্চয়তা দেখে এজন্য তিনি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের বরাবরে চিঠিও লিখেছিলেন স্থানীয়ভাবে চিকিৎসকের ব্যবস্থা করার জন্য
 নিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য নিযুক্ত মূল দলটি রওয়ানা হবে ২৪ শে এপ্রিল ২০০৮ তারিখে দলটির নেতৃত্বে থাকবেন অজিত দেববর্মা সাথে যাবে সব মালপত্র তিনটে গাড়িতে করে একটি মারুতি জিপসি, একটি বলেরো জীপ এবং একটি স্বরাজ ম্যাজদা কোম্পানির মিনিবাস জিপসি গাড়ি মিনিবাস সরাসরি পৌঁছে যাবে কেন্দ্রীয় সংরক্ষিত বল বা সি.আর.পি.এফের আঞ্চলিক সদর পাঞ্জাবের জলন্ধরে৷ জীপ গাড়ির চালক যোগিন্দার তার সাথে যাচ্ছে সেপাই নারায়ণ শর্ম্মা স্যার কৌশিক রায় যাবেন আগরতলা থেকে দিল্লী পর্যন্ত ইন্ডিগোর বিমানে দিল্লী বিমান বন্দর থেকে জীপ-গাড়ি তাঁদের তুলে নেবে তাঁরা দু`জন রওয়ানা হচ্ছেন ৩০ শে এপ্রিল আর ফিরে আসবেন শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা হয়ে প্লেনে ১৩ জুন ২০০৮ ইং তারিখে বাকিরা ফিরবে গাড়ির সাথে
এই উন্মাদনা দেখে আমিও জড়তা ঝেড়ে ফেলি আমার সৌভাগ্য ৩০ তারিখের ইন্ডিগো বিমানের টিকিট তখনও পাওয়া যাচ্ছিল আমি শর্ম্মা স্যার কৌশিক রায়ের সাথে একই প্লেনে চাপতে মনস্থ করি সেই অনুযায়ী টিকিট সংগ্রহ করি আমার মনে একটি চনমনে ভাব বিরাজ করে জার্মান দার্শনিক গোঁথের একটি উক্তি বার বার মনে আসে: “এখন বিশ্রাম নয় ! জীবন বহে যাচ্ছে, মৃত্যুর আগে একবার সাতরে পার হবার চেষ্টা কর একটি দূরহ বাঁধা অতিক্রম করে ভবিষ্যৎ সময়ের কাছে দৃষ্টান্ত রেখে যাও৷৷
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আসন্ন সফরের ঘটনাবলী ডাইরিতে লিপিবদ্ধ করব
(
ক্রমশ:)