Tuesday, 6 December 2016

আবার সেই ইদ্রিসের বাপ!



মেঘনাদবাবুর প্রিয় সাহিত্যিক সত্যজিৎ রায় ৷ 'ফেলুদা' আর 'প্রফেসর শঙ্কু'-র তিনি ভক্ত ৷ পাশাপাশি সত্যজিৎ রায়ের ছোটগল্পগুলিও তাঁর প্রিয় ৷ বিশেষ করে ‘অসমঞ্জবাবুর কুকুর’ গল্পটি তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ৷ অসমঞ্জবাবু এক নির্বান্ধব মানুষ৷ অফিসে কাজ করেন ৷ অফিসের বাইরে কারো সাথে খুব একটা মেশেন না ৷ তবে কুকুর তাঁর প্রিয় ৷ একটি নেড়ি কুকুর পালেন ৷ নাম ব্রাউনি ৷ ব্রাউনি স্বাভাবিক কুকুর নয় ৷ সে মজার কথা শুনলে হাসে ৷ মজার ঘটনা দেখলে হাসে ৷ ব্রাউনির এই বিচিত্র আচরণ কেউ বিশ্বাস করেনা ৷ অসমঞ্জবাবুর কুকুর যে হাসে সেই কথা ঘটনাচক্রে এই খবর বেরিয়ে গেল খবরের কাগজে ৷ প্রচুর মানুষের আগ্রহের বিষয়ে পরিণত হল ব্রাউনির হাসি ৷ কিন্তু ব্রাউনি কারণ ছাড়া হাসে না ৷ এক বিদেশী ভদ্রলোক ব্রাউনিকে কেনারও ইচ্ছা প্রকাশ করলেন ৷ অনেক টাকা অফার করলেন ৷ কিন্তু অসমঞ্জবাবু ব্রাউনিকে বিক্রি করতে রাজি হলেন না ৷ সাহেবের টাকার গরম কাজে এল না ৷ সাহেব ব্যর্থমনোরথ হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন ৷ তাই দেখে, ব্রাউনি পেছন থেকে হাসতে থাকল ৷

গত পরশু রাত্রে গল্পটি মেঘনাদবাবুর মনে এল ৷ মেঘনাদবাবুও কুকুর পোষেন ৷ তাঁর কুকুরের নাম বাঘা ৷ বাঘা কিছুটা মোটা হয়ে গেছে ৷ রাত্রিতে ঘুমালে নাক ডাকে ৷ পরশু ছিল রবিবার ৷ মেঘনাদবাবু ঘরে একাই ছিলেন ৷ পাশে ফ্লোরে তার বিছানায় বাঘা ঘুমচ্ছিল ৷ রাত তখন আনুমানিক দেড়টা ৷ হঠাৎ মেঘনাদবাবুর ঘুম ভেঙ্গে গেল ৷ ঘরের ভিতর ইংরেজিতে কেউ কিছু পড়ছে, ‘হুয়েন হি এরাইভড্ হি সো দ্য চিল্ড্রেন প্লেয়িং ইন দ্য গার্ডেন ..... ‘হুয়াট আর ইউ ডুয়িং হিয়ার?’ হি ক্রাইড ইন এ ভেরি গ্রাফ্ ভয়েস, এণ্ড দ্য চিল্ড্রেন রেন অ্যাওয়ে.....৷’

অস্কার ওয়াইল্ডের ‘স্বার্থপর দৈত্যের গল্প’ ৷ মেঘনাদবাবু মাধ্যমিকে পড়েছেন ৷ এক সময় পুরোটা মুখস্থ ছিল ৷ তিনি বিছানায় ওঠে বসেন ৷ তখনই অসমঞ্জবাবুর কুকুরের গল্পটি মনে আসে ৷ তাঁর মনে হয় বাঘারও অসমঞ্জবাবুর কুকুরের মত গুণ আছে ৷ কান পেতে শোনার চেষ্টা করেন ৷ তাঁর ওঠে বসার আওয়াজে বাঘারও ঘুম ভেঙ্গে যায় ৷ এবার তিনি বাথরুম হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েন ৷ কিছুটা ঘাপটি মেরে থাকেন ৷ বাঘা আবার নাক ডাকাতে থাকে ৷ এবার অন্য সুরে ৷ যান্ত্রিক সুর ৷

পরদিনও এই ঘটনার রেশ মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেন না ৷ তাঁকে বেশ আনমনা দেখায় ৷ ভাস্করবাবু তাঁর সহকর্মী ৷ বয়সে ও পদে তাঁর থেকে কিছুটা ছোট ৷ সন্ধ্যার পর সে এসেছে তাঁর রুমে ৷ দু`জনে একসাথে একটি বিয়ে বাড়িতে যাবেন ৷ প্রণয়বাবুর মেয়ের বিয়ে ৷ দু`জনেই প্রণয়বাবুর সাথে কাজ করেছেন ৷ অবশ্য আলাদা আলাদা ৷ তাঁর মনের অস্বস্থি ভাস্করের নজর এড়ায় না ৷ সে কারণ জানতে চায় ৷ মেঘনাদবাবু তাঁর গতরাতের অভিজ্ঞতা খুলে বলেন ৷ জানান যে ইন্টারনেট ঘেঁটেও এর সদুত্তর কিংবা পুষ্টি পাননি ৷ কুকুরের বিচিত্র সব নাসিকা-গর্জনের উল্লেখ আছে ৷ ইংরেজি গল্প পড়ার উল্লেখ নেই ৷

ভাস্কর হেসে বলে, ‘স্যার, কথাটা আপনার কাছে কাকতালীয় শোনাবে! প্রণয়বাবুর নাসিকা-গর্জন শোনেও আমি একবার আপনার মত হতবিহবল হয়েছিলাম ৷ বছর চারেক আগে আমরা দু`জন গিয়েছি নতুন দিল্লীতে ৷ নর্থ ব্লকে একটি তদন্ত ছিল ৷ বিভাগীয় তদন্ত ৷ এই সূত্রে তথ্য সংগ্রহ ৷ সাক্ষীকে জেরা ৷ প্রণয়বাবু তদন্তকারী অফিসার ৷ আর আমি তত্ত্বাবধায়ক ৷ আমরা উঠেছিলাম রাজকুমার টিকেন্দ্রজিৎ মার্গে, দিল্লীর ত্রিপুরা ভবনে ৷ একই রুমে দু`টি আলাদা আলাদা বেডে থাকার ব্যবস্থা ৷ এর বছর খানেক আগে প্রণয়বাবু ভীষণ এক দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে ওঠেছেন ৷ অন্ধকারে স্কুটার নিয়ে একটি দাঁড় করিয়ে রাখা ট্রাকের পেছনে ঢুকে গিয়েছিলেন ৷ মাথায় হেলমেট ছিল ৷ তা সত্ত্বেও গুরুতর চোট আসে ৷ নাক কিছুটা বেঁকে যায় ৷ তখনও ঔষধ ব্যবহার করতেন ৷

তখন রাত্রি প্রায় দশটা ৷ খাওয়ার পর প্রণয়বাবু মেঝেতে ফাইল খুলে বসলেন ৷ বিশালাকারের ফাইল ৷ বাবু হয়ে বসে কাগজপত্র মেলাচ্ছিলেন ৷ পিঠের পেছনে একটি বালিশ ৷ সোফার গদি ৷ মাঝে মাঝে নাকে ন্যাসাল ড্রপ দিচ্ছিলেন ৷ আলাদা আলাদা ঔষধ ৷ একেকবার দিয়েই ঘুমিয়ে পড়েন ৷ সাথে নাসিকা-গর্জন ৷ কিন্তু অদ্ভুত সুরেলা ৷ যেন উচ্চাঙ্গ সংগীতের রাগিণী ৷ আবার ওঠে পড়েন ৷ নতুন ড্রপ দেন ৷ আবার নতুন সুর ৷ একবার মনে হল, 'এ্যায় মেরে জোহরা জবী...'এর সুর । আরেকবার যেন, 'এক চতুর নার, বড়া হোশিয়ার…’৷ কখনো যেন, ‘কার মঞ্জীর রিনিঝিনি বাজে…’ এর সুর ৷ ততক্ষণে আমার কান ঝালাপালা অবস্থা ৷ যতই সুরেলা শোনাক, আমার ঘুম লাটে উঠল ৷ পরদিন ত্রিপুরা ভবনের কর্তৃপক্ষকে বলে অন্য রুম নিলাম ৷’
- আবার সেই ইদ্রিসের বাপ!
- সেটা আবার কি স্যার ৷
- ইন্টারনেট ঘেঁটে একটি জোকস পেয়েছি ৷ এক মাওলানা এক গ্রামে ওয়াজ করছেন ৷ তিনি বললেন মৃত্যুর পর যে সব পুরুষ বেহেশতে যাবে তারা সেখানে হুর পরী পাবেন ৷ ভাল ভাল খাবার পাবেন ৷ যা চাইবেন তাই পাবেন ৷ এই অবস্থায় ওই মাহফিলেরই এক মহিলা হুজুরকে প্রশ্ন করলেন বেহেশতে নারীরা কি পাবে ?
এমন প্রশ্নে হুজুর একটু বিব্রত হয়ে পড়লেন ৷ তাঁর এই বিষয়ে জানা ছিল না ৷ তিনি একটু ভেবে উত্তর দিলেন, ‘সেখানে নারীরা তার স্বামীকে ফিরে পাবে ৷’
এই শোনে এক মহিলা চেচিয়ে বলে উঠলেন : আবার সেই ইদ্রিসের বাপ !

পুনশ্চঃ ইদ্রিসের বাপের মেঘনাদবাবুর মত নাক ডাকে ৷


Sunday, 27 November 2016

জনার্দনদা



পুলিশের চাকুরীতে যোগ দিয়ে আমার একটি অসুবিধা হয়েছে ৷ রকে বসে কিংবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আড্ডা দিতে পারিনা ৷ অজান্তেই লোকেরা তদন্তের কাজে এসেছি ভেবে বসে ৷ অনেকে আবার অবসরে এসেছি কিনা প্রশ্ন করে ৷ ছ`সাত বছর আগের কথা ৷ আমি তখন পুলিশ সদরে কাজ করি ৷ সারাদিন বাজেট, ফাইল পত্রের মধ্যে ডোবে থাকি ৷ রাত্রি আটটার আগে বেরুতে পারি না ৷ তাই অনেকদিন অফিসের পর দু`এক কিলোমিটার হাঁটার চেষ্টা করি ৷ উদ্দেশ্য খোলা হাওয়ায় শ্বাস নেওয়া ৷ আগরতলা শহরে প্রচুর স্ট্যান্ডিং ক্লাব আছে ৷ অজান্তেই লক্ষ করলাম সপ্তাহে অন্তত দু`তিন দিন একটি স্ট্যান্ডিং ক্লাবে দাঁড়িয়ে পড়ছি ৷ আড্ডাস্থলের পাশে বেশকিছু দোকান ৷ বিশেষ করে একটি স্টেশনারি-কাম-পান-সিগারেটের দোকানের কথা বলতেই হয় ৷ মধ্যরাত্রির পরও খোলা থাকে ৷ অনেক পরিচিত জনই পান কিংবা সিগারেট কিনতে আসে ৷ আমাকে ওই পরিবেশে দেখে অবাক হন ৷ কুশল মঙ্গল জিজ্ঞেস করেন ৷ যার কথা আগেই উল্লেখ করেছি ৷

একদিন এক ভদ্রলোক আমার স্ত্রীর নাম নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সে কেমন আছে ৷ আমার স্ত্রী ডাক্তার ৷ ভদ্রলোকের পরিচিত ৷ তিনি দেখতে একটু কালো ৷ বেটে-খাটো ৷ একটু ভুঁড়ি আছে ৷ তাম্বূল-রঞ্জিত ঠোট ৷ বয়সে আমার চেয়ে বড় ৷ পান কিনতে পাশের দোকানে এসেছিলেন ৷ আমার পরিচিত নন ৷ আমি তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘পান খাওয়ার নেশা কি জন্মসূত্রে না কর্মসূত্রে?’
তিনি হেসে উত্তর দিলেন, ‘কর্মসূত্রে, নর্থে পোস্টিং এর সময় ৷
আমিও সেটাই আঁচ করেছিলাম ৷ কারণ ভদ্রলোকের গলায় কুমিল্লার ভাষা ৷ ত্রিপুরায় সিলেটীরা পান খায় জন্মসূত্রে ৷ অন্যরা কর্মসূত্রে ৷ ইতিমধ্যে, স্ট্যান্ডিং ক্লাবের অন্যরাও তাঁকে নিয়ে পড়েছে ৷ সবাই দেখলাম তাঁকে জনার্দনদা বলে সম্বোধন করছে ৷ ভদ্রলোক পেশায় ডাক্তার ৷ অবসরপ্রাপ্ত ৷ ক্রমে তাঁর সম্বন্ধে আরো জানলাম ৷ জেনে ভীষণ পুলকিত হলাম ৷ একদিন তিনি আমারও জনার্দনদা হয়ে গেলেন ৷

তখন তিনি সবে ডাক্তারি পাশ করেছেন ৷ লোকসেবা আয়োগের পরীক্ষা দিয়ে সরকারি চাকুরীও পেয়ে গেলেন ৷ সত্যি-কথা বলতে কি জনার্দনদার নাম ছিল তালিকার একদম উপরে ৷ তিনি আশা করেছিলেন তাঁর পোস্টিং শহরে কোথাও হবে ৷ কিন্তু তাঁর পোস্টিং হল উত্তর জেলার এক প্রত্যন্ত জনপদে ৷ জম্পুই পাহাড়ের পাদদেশে ৷ একটি ডিসপেনসারিতে ৷ এখনো সেখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অপ্রতুল ৷ প্রায়ই বর্ষায় ধস নামে ৷ রাস্তার অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ৷ আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে পরিস্থিতি সহজেই অনুমেয় ৷ রোগীর ভিড় কম ৷ তাঁর সময় মোটামুটি ভালোই কাটছিল ৷ ইতিমধ্যে এক ভদ্রলোকের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে ৷ অবসরপ্রাপ্ত ফৌজি ৷ পাহাড়ের উপরে একটি কটেজে থাকেন ৷ আর সকাল থেকেই রাম গেলেন ৷ রোগীর ভিড় কমে গেলে জনার্দনদাও তাকে সাহচর্য দেন ৷

তখন শীতকাল ৷ দপ্তরের এক উচ্চ আধিকারিক গেলেন তাঁর ডিসপেনসারি পরিদর্শনে ৷ সাথে তাঁর পারিষদ ৷ চমক দেবার জন্য সফর ৷ জনার্দনদা তখন বন্ধুর কটেজে ৷ কম্পাউন্ডার বলল, ‘স্যার, একটি কলে গেছেন ৷
তাঁর অবর্তমানে আধিকারিকেরা রেকর্ডপত্র দেখলেন ৷ ডিসপেনসারির আশপাশ ঘুরে দেখলেন ৷ দেখে খুশি হলেন ৷ বাইরে সুন্দর রোদ্দুর ৷ ডিসপেনসারির চেয়ার-টেবিল বাইরে নিয়ে এসে বসলেন ৷ এমনকি ডাক্তারবাবুর চেয়ারও তখন বাইরের উঠানে ৷ খবর পেয়ে, কিছুটা সময় নিয়ে জনার্দনদা এলেন ৷ এসেই রাগের সাথে তর্ক শুরু করলেন আধিকারিকদের সাথে ৷ ‘স্যার, আপনাদের কি আক্কেল শরম নেই? ফার্নিচারগুলি বাইরে নিয়ে এসেছেন? আমার এখানে না আছে ক্লাস ফোর ৷ না আছে জি ডি এ ৷ এইগুলি এখন কে ঢোকাবে?’

তাঁর এই মূর্তি দেখে আধিকারিকেরা ঘাবড়ে গেলেন ৷ সবাই দাঁড়িয়ে পড়লেন ৷ এবার জনার্দনদা নিজেই হাত লাগালেন ৷ চেয়ার-টেবিলগুলি ঘরে ঢোকাতে শুরু করলেন ৷ তাঁর দেখাদেখি আধিকারিকেরাও হাত লাগালেন ৷ পরিদর্শন লাটে ওঠলো ৷ আধিকারিকেরা চলে গেলে জনার্দনদা বললেন, ‘দিছিতো চড় কষাইয়া!’
সবাই আৎকে ওঠলো ৷ জনার্দনদা দাবি করলেন ঘরের ভিতর একা পেয়ে একজন আধিকারিককে চড়িয়ে দিয়েছেন ৷ কেউ বিশ্বাস করল ৷ কেউ করল না ৷ কিন্তু দিন কয়েক পর জনার্দনদা দপ্তর থেকে একটি নোটিস এল ৷ কারণ দর্শানোর নোটিস ৷ তাঁর অভব্য আচরণের বিবরণ বিবরণ ৷ সাথে প্রশ্ন, ‘কেন তাঁকে পাগল বলে বিবেচনা করা হবে না?’
উত্তরে জনার্দনদা লিখলেন, ‘আমি যে-কোনো বোর্ডের সামনে বসতে রাজি ৷ কিন্তু একটি শর্ত আছে ৷ আমি বোর্ডের সদস্যদের তিনটি করে প্রশ্ন করব ৷ চিকিৎসাশাস্ত্রের উপর ৷
কেউ অপদস্থ হওয়ার ভয়ে বোর্ডের সদস্য হতে চাইল না ৷ তিনি বহাল তবিয়তে স্থানীয় জনগণের সেবা করতে থাকলেন ৷ সাথে প্রাইভেট প্র্যাকটিস ৷ স্থানীয় নেতারাও প্রথম প্রথম তাঁর উপর খুশি ছিলেন ৷ প্রায়ই গ্রাম-প্রধান চিরকুট লিখে পাঠাতেন, ‘ডাক্তারবাবু, রোগীটি আমার বিশেষ পরিচিত ৷ চিটে রাখিয়া চিকিৎসার ব্যবস্থা করিবেন ৷
জনার্দনদা দু`একদিন প্রধানের অনুরোধ রক্ষা করলেন ৷ চিটে অর্থাৎ সীটে রেখে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন ৷ পরের বার অনুরোধ এলে প্রধানের নাম নিয়ে রোগীকে বললেন, ‘আপনাদের প্রধানের মত মানুষ হয় না ৷ হাসপাতাল সাপ্লাইয়ের ঔষধে কি রোগ সারে? এই সেদিন পরেইশ্যার জন্য সব ঔষধ কিনে দিলেন ৷

এইটুকুই যথেষ্ট ৷ প্রধানের কাছ থেকে চিরকুট আসা বন্ধ হয়ে গেল ৷ কিছুদিন পর জনার্দনদা বদলি হলেন ৷ মফঃস্বলের একটি মহকুমা সদর হাসপাতালে ৷ তিনি তখন ইন-চার্জ ৷ হাসপাতালে একটিই অ্যাম্বুলেন্স ৷ দু`জন ড্রাইভার ৷ মাঝে মাঝে রোগী রেফার হয়ে জেলা-সদরের হাসপাতালে যায় ৷ কখনো আগরতলায় জি বি হাসপাতালে ৷ একজন ড্রাইভার ছিল কিছুটা ম্যালিঙ্গার ৷ রাত্রিতে ডিউটি শোনালে মুখ ব্যাজার করত ৷ একদিন রাত্রিতে সে বলল তার পায়ে ব্যথা ৷ জনার্দনদা তার পায়ের এক্স রে করালেন ৷ তারপর এক্স রে প্ল্যাট পাল্টে দিলেন ৷ দেখা গেল ড্রাইভারের পায়ে  ফ্র্যাক্চার ৷ সুতরাং তার পায়ে প্লাস্টার পরল ৷ তিনমাস ধরে তার চিকিৎসা চললো ৷ ততদিনে ড্রাইভারের অবস্থা কাঁদো-কাঁদো ৷ সরকারী গাড়ির ড্রাইভারদের কাছে গাড়ি চললেই পায়ে-লক্ষ্মী ৷ অনেক কষ্টে সে আবার গাড়ি চালানোর অধিকার ফিরে পেয়েছিল ৷

রাত্রিতে পুলিশরা নেশাগ্রস্থ লোকদের ধরে আনে ৷ হাসপাতালে নিয়ে যায় মেডিকেল পরীক্ষা করাতে ৷ অনেক সময় রক্ষীরাও অল্প-বিস্তর খেয়ে থাকে ৷ ডাক্তারবাবু সাধারণত নেশাগ্রস্থ লোকটিকে তাঁর সামনে হাঁটতে বলেন ৷ একবার-তো হাঁটতে বলায়, এক মদোতি কমরের দড়ি নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল ৷ রাত্রিতে জনার্দনদার ডিউটি থাকলে স্থানীয় থানার দারোগাবাবুরা ধৃত মদোতিকে হাসপাতালে পরীক্ষার জন্য পাঠাতেন না ৷ পরদিন পাঠালে ঠিক লিখে দিতেন ৷ একদিন রাত্রিতে এক দারোগাবাবু নাছোড়বান্দা ৷ রাত্রিতেই মেডিকেল পরীক্ষা করাবেন ৷ জনার্দনদা লিখে দিলেন, ‘ধৃত ব্যক্তি মদ খেলেও, সুস্থ ৷ নিজের উপর নজর রাখতে পারবে ৷ তবে তাকে যে দারোগাবাবু নিয়ে এসেছেন তিনি নেশাগ্রস্থ ৷ নিজের উপর তাঁর কর্তৃত্ব নেই ৷

দারোগাবাবুতো সেই রিপোর্ট ভালো করে পড়ে দেখেন নি ৷ সেই রিপোর্ট আদালতে দাখিল করে দিলেন ৷ আদালতে দারোগাবাবু কি রকম নাকাল হয়েছিলেন, তা সহজেই অনুমেয় ৷ এরপর জনার্দনদা বদলি হয়ে এলেন আগরতলায় ৷ একদিন একদল লোক একটি ছোট ছেলেকে নিয়ে এল ৷ ছেলেটি ফিট হয়ে গেছে ৷ বিরাট ব্যবসায়ী পরিবার ৷ এসেই হই হই শুরু করল, ‘ডাক্তারবাবু বাঁচান ৷ একদম সেক্স নাই ৷
জনার্দনদা দ্রুত তিনটি কাগজে ব্যবস্থাপত্র লিখলেন ৷ বললেন, ‘এই ঔষধগুলো এখুনি চাই ৷ আপনারা তিনটে গ্রুপে বেরিয়ে যান ৷
ভিড় দ্রুত ফাঁকা হয়ে যায় ৷ জনার্দনদা বাচ্চাটির চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন ৷ তার সেন্স ফিরে আসে ৷ ঘণ্টা খানেক পর তিনটি দলই ফিরে আসে ৷ তারা কেউই ঔষধ পায়নি ৷

পাবে কি করে? ওই নামেতো কোনো ঔষধই নেই ৷
পুনশ্চঃ, কিছু কিছু শিশুরোগীর অভিবাবকরা ন্যাগিং টাইপের হন ৷ এমনি এক অভিবাবক বাচ্চাকে জনার্দনদার কাছে দেখিয়েছেন ৷ বাচ্চা অনেকটা সুস্থও হয়েছে ৷ আরো হচ্ছে ৷ কিন্তু ভদ্রলোক খুশি নন অগ্রগতিতে ৷ তিনি এসে জনার্দনদার কাছে ঘেনর ঘেনর শুর করলেন ৷ জনার্দনদা নতুন একটি ঔষধ দিলেন ৷ ভদ্রলোককে বললেন, ‘আপনার ফোন নাম্বারটি দেবেন? আমি পরে ফোন করে জেনে নেব, রোগী কেমন আছে?’
ভদ্রলোকের আবার ল্যান্ড লাইন ৷ তিনি খুশিমনে নাম্বার দিলেন ৷ জনার্দনদা ভদ্রলোককে প্রথম ফোন করলেন রাত্রি এগরোটা নাগাদ, ‘আপনার বাচ্চা এখন কেমন? অসুখ কমছে নি?’
-   হ্যা ডাক্তারবাবু এখন বেশ ভালো ৷
জনার্দনদা প্রোস্টেটে ভোগেন ৷ রাত্রি একটার দিকে একবার ঘুম থেকে উঠেছেন ৷ টয়লেট থেকে এসে ফোন করলেন, ‘আমি ডাক্তারবাবু কইতাছি ৷ আপনার বাচ্চা এখন কেমন? অসুখ কমছে নি?’
-   হ্যা ডাক্তারবাবু, এখন অনেকটা কম ৷ ঔষধটা ধরেছে ৷
তিনটের পর আবার ভদ্রলোককে ফোন করলেন, ‘আমি ডাক্তারবাবু কইতাছি ৷ রোগীর এমন অবস্থা নিয়া ঘুমানো যায় না ৷ খুবই দুশ্চিন্তায় আছি ৷ আপনার বাচ্চা এখন কেমন? অসুখ কমছে নি?’

-   কমছে, কমছে, কমছে ৷৷

Sunday, 20 November 2016

ব মাতঙ্গ গন্ধ.....



আচ্ছা আপলোগ বোলতা-কো ক্যায়া বোলতে হ্যাঁ?’
-   বাঁতাইয়ে না ৷
-   নেহি বাঁতায়েঙ্গে না! লেকিন ম্যারে জেইসে কুচ নর্থ ডিসট্রিক্ট কা লোগ বোলতা কো, বোলতাই বোলতে হ্যাঁ ৷ কভি কভি কহি লোগ বোলতা-কো ভীমরুলভি পুকারতা হ্যাঁ ৷ লেকিন বোলতা বল্লা পোকা সে আলগ হ্যাঁ ৷ বল্লার ডিম সে হামলোগ মছলি পাকাড়তা হুঁ ৷
এতদিন আমি ভাবতাম তারাপদ রায়ের এই হিন্দি বুঝি আমাদের মতো বাঙালদের প্যাটেন্ট নেওয়া ৷ কিন্তু দু`দিন আগে আমার মিথ ভেঙ্গে গেছে ৷ সৌজন্যে বদন কিতাবের এক মিতা ৷ হিন্দিভাষী লোকেরাও অল্প-বিস্তর আমার মত হিন্দি বলে ৷ গল্পটি হুবহু তুলে দিচ্ছি: 
আমাদের হিন্দি টিচার ছিলেন একজন ৷ তিনি বিহারী ৷ স্যারের ইংরেজি উচ্চারণগুলি একটু কেমন জানি ৷ হিন্দি হিন্দি ভাব ৷ আমরা তখন নাইনে পড়ি৷ স্যার আমাদের গল্প শোনাতেন ৷ একদিনের গল্প: ‘সুনো বাচ্চো ৷ এক জঙ্গল মে এক ফাক্স ঔর এক সারস থে ৷
 এক ছাত্র বলল - স্যার ফাক্স ক্যায়া হ্যায় ?
 স্যার---- ফাক্স ও জো লোমরী হ্যায় না ৷
 ছাত্র ---- স্যারজী, হাম নে সুনা হামারি স্কুল কে ইধার ওধার বহুত লোমরী রাত হোনে পর ঘুমতে রহতে হ্যায়?
স্যার --- আরে হাঁ আ আ আ... ইধার বহুত সারে জয়কাল হ্যায় ৷ হামলোগ ঢের রাত পে তো কোয়ার্টার সে কভি নেহী নিকলতে ৷
 ছাত্রছাত্রী সমস্বরে ---- জয়কাল !!!!! ও ক্যা হ্যায় ?
স্যার ---- জয়কাল ল ল ল .... !!! ও ফাক্স সে থোড়া বঢ়া হোতা হ্যায় ৷ বহুত সারে জয়কাল ৷ হমলোগ করিডোর সে টর্চ লেকে দেখতে রহতে থে ৷ এক সে এক বঢ়া জয়কাল ৷ জয়কাল কা বচ্চে ভি থে ৷
 ছাত্র --- লেকিন জয়কাল হ্যাঁ ক্যায়া? কোই ভূত?
 আরেক ছাত্র --- কোই "কাল" পিকচার যেয়সা সিচুয়েশন তো নেহী ? ও অজয় দেবগন কে তরহা কোই man cum tiger?
স্যার --- নেহী ৷ ও জয়কাল ....৷ লোমরী সে থোড়া বঢ়া ৷ পুছ ভি হ্যায় !!!
এক দুষ্ট ছাত্র --- স্যার, ও Jackal হ্যায় ক্যা?
 স্যার --- হাঁ ....৷ ওহী তো ম্যা কবি সে বোল রাহা হুঁ ৷ ও জয়কাল ৷ পুরে দিন নিকলতে নেহী ৷ লেকিন রাত কো জয়কাল ই জয়কাল ৷
 সব ছাত্রছাত্রী সমস্বরে --- ও ও ও ও ও ও ফ্ !!!!!
এ-তো গেল শহরের ইংলিশ মিডিয়ম স্কুলের গল্প ৷ এবার উত্তর জেলার এক সরকারী হাইস্কুলের গল্প ৷ যৌথ স্কুল ৷ অবস্থান উপজাতি স্বশাসিত জেলাপরিষদ সংলগ্ন এলাকায় ৷ বাঙ্গালী এবং জনজাতি উভয় অংশের ছেলে-মেয়েরা পড়ে ৷ বাঙ্গালীদের মধ্যে ডার্লং, হালাম, রিয়াং প্রভৃতি জনজাতির ছেলে-মেয়েরা ৷ তখন শারীর শিক্ষা মাধ্যমিকের অন্তর্গত ৷ স্কুলে যোগাসন এবং যোগাসনের উপকারিতা শেখানো হত ৷ খাতার এক পাতায় আসনের ভঙ্গীর ছবি আঁকতে হত ৷ অন্য পাতায় আসনটি করার পদ্ধতি, সময়, উপকারিতা ইত্যাদি লিখতে হত ৷ হাফ-ইয়ারলি পরীক্ষার আগের কথা ৷ সব ছাত্র-ছাত্রী একে একে খাতা জমা দিচ্ছে ৷ সবার শেষে এল কুম্ভরাম রিয়াং ৷ কুম্ভ পড়াশুনায় খুব একটা ভালো নয় ৷ নিজেই নিজেকে ‘নরম শয়তান বলে জাহির করে ৷ সবাই দেখল কুম্ভর আঁকা আসনের ছবি সবচাইতে সুন্দর হয়েছে ৷ অবিকল বইয়ের ছবির মত ৷ তখন জেরক্সের এত রমরমা হয় নি ৷ হঠাৎ কিছু একটা সন্দেহ হওয়ায় স্যার খাতার পাতার গন্ধ নিলেন ৷ তিনি কেরোসিনের গন্ধ পেলেন ৷ গ্রাম-দেশে সাদা কাগজ কেরোসিন তেলে চুবিয়ে এবং তারপর শুকিয়ে ট্রেসিং পেপার হিসাবে ব্যবহার করা হয় ৷ কুম্ভ সম্ভবত তাই করেছিল ৷ কিন্তু সে অস্বীকার করল ৷ স্যার সব ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে একে একে গন্ধ বিচার করালেন ৷ সবাই বলল কেরোসিনের গন্ধ পাচ্ছে ৷ সবশেষে এল কুম্ভের টার্ন ৷ সে গন্ধ শুকার পর গম্ভীরভাবে বলল: ‘ব মাতঙ্গ গন্ধ..... ব কেরোসিন গন্ধ....ব বুছতুছ পায় না ৷

আমিও এর অর্থ অদ্যাবধি খুঁজে পাই নি ৷

Thursday, 10 November 2016

SURROGATE ACCOUNTS



It was Tuesday, the 8th November, 2016. The opera hall was overflowing with crowd. Meghnadbabu was happy that he could manage a seat. Towards the end of the program, two pretty looking artists, one boy and the girl were performing dance in glittering costume. The young man was in pinkish attire. The girl had dressed herself with a slightly yellowish sharee. Both the dresses were studded with beautiful embroidery design with zari and glittering like peacock tail feathers under the dazzling light of the auditorium in the backdrop of Tagore song:

“Ami chanchal hey
Ami sudurer piyashi
Din chole jai ami anmone tari asha cheye thaki batayane
Ogo prane mone ami je tahar paros pabar prayashi
Ogo sudur bipul sudur tumi je bajao byakul basori
Mor dana nai achi ak thai se katha je jai pashori
Ami unmona hey......
......
I am restless
I am thirsty for the expanse
Days go by; I sit attentively by my oriel waiting for her
I am fully hers: I am the desire of her caress
O vastness, o huge expanse, you play your distraught flute
I have no wings, no two abodes, I overlook all
I am listless...”

One middle-aged gentleman was sharing the seat, next to Meghnadbabu from the very beginning. He is a wise man which one can easily make out from his appearance. Suddenly, the gentleman said in a deep anguish, ‘Well said! You have no wings. Still, you can fly. But, from tomorrow culling will begin and you all will die.’
He couldn’t resist himself from putting the gentleman a question, ‘Whom did you mean?’
-   Why? I am telling about the actor and the actress on the stage. They are currency notes. They can fly without wings. Look at their dresses.’

Meghnadbabu cast a glance at their dresses. Then, to his utter surprise he found that the boy’s attire was similar to the Indian one thousand rupees currency note. Similarly, the girl’s sharee resembled the Indian five hundred rupees currency note. He became excited and said to the gentleman, ‘But, you were telling something else! Culling begins tomorrow! Everybody will die.’
-   Certainly they will die! They are not human beings! Rather, they are currency notes similar to birds. Bird flu has started. Some find it similar to Ranikhet or Newcastle disease. Their death sentence has been announced. Today from the midnight they will become obsolete. They will be hunted and killed. This culling will strengthen our economy.
The function came to end in the meantime. They continued chatting. Meghnadbabu said, ‘They are currency notes! Not human beings! Resemble birds! What do you try to mean?’
-   Why? Haven’t you witnessed currency notes to fly? They can fly without wings and even move without limbs. Where are you? Let me introduce you with someone.
The gentleman called a lady from behind, ‘Satyabati, please come here.’
A dusky beauty turned towards them with a sweet fresh-air fragrance. Meghnadbabu could easily identify Satyabati alias Dasheyi alias Basabi of the epic Mahabharata era. Her name is Dasheyi because she is the daughter of Dasraj. Again, she is the daughter of Chedi king Uparichar and so her name is Basabi. She has many other names Gandhakali, Kali, Matshyagandha, Padmagandhya, Satya, Jojangandha and so on.
Meghnadbabu was completely at loss. Seeing his condition, the gentleman said, ‘Do you know why I have introduced with Satyabati?’
-   Why?
-   Her mother is Apsara Adrika. She is actually a surrogate mother. In surrogacy a woman agrees to give birth a child from artificial insemination against an already fertilized egg. The host woman surrenders parental rights, often in exchange of money. In sayabati’s case, the royal couple of Chedi donated the fertilized egg. Can you guess why I have narrated the story?

Then, without waiting for Meghnadbabu’s response he said, ‘From tomorrow onwards, owners of black-money start searching surrogate accounts holders. They will try to keep their money in these accounts till the gestation period is over. Black money will become legal.’
Meghnadbabu could realize that it’s a dream. But he fails to distinguish if it is a nightmare or sweet one.


Wednesday, 12 October 2016

পৃথিবীর আসল রূপ



এবার পূজার মহা নবমীর দিন গিয়েছিলাম বিশালগড় ৷ তখন সন্ধ্যা রাত্রি ৷ প্রতি বছরই যাই ৷ বেশকিছু আকর্ষণীয় পূজা থাকে সেদিকটায় ৷ এবার যেন কেমন ম্যার-ম্যারে ৷ উড়ান পুলের কাজ চলছে ৷ রাস্তা ফোর-লেন হচ্ছে ৷ অনেকের জায়গা-সম্পত্তির উপর কোপ পড়েছে ৷ হয়তো অন্য স্থানীয় কারণও থাকবে ৷ ফেরার পথে তাজের সাথে দেখা ৷ বাধারঘাট সি.এন.জি. স্টেশনের কাছে ৷ তাজ ইসলাম অটো-চালক ৷ অটোতে গ্যাস ভরছে ৷ তারপর সারারাত ট্রিপ দেবে ৷ তাজের বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে ৷ বাড়ি আগরতলার পশ্চিম প্রতাপগড়ে ৷ ছ`সাত বছর আগের কথা ৷ আমি তখন অরুন্ধতীনগরে পুলিশ আবাসনের কোয়াটার্সে থাকি ৷ ছেলে মাধ্যমিক দেবে ৷ ত্রিপুরায় মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়াশুনা এখন মূলত: প্রাইভেট টিউটর নির্ভর ৷ আমার ছেলের ক্ষেত্রেও এর বিশেষ ব্যতিক্রম ছিল না ৷ একটি অল্টো-গাড়ি কিনেছিলাম ৷ পুলিশের কাজে সরকারী গাড়িতেই চলাফেরা করি ৷  গাড়িটি প্রায় বসেই ছিল ৷ কোন স্থায়ী ড্রাইভার ছিল না ৷ দিনে গড়ে পাঁচ-দশ কিলোমিটারই চলত ৷ এবার একজন স্থায়ী ড্রাইভার রাখলাম ৷

মহাদেব দেখতে কালো ৷ রোগা-পাতলা শরীর ৷ বয়স বিশ পেরিয়েছে ৷ অ-বিবাহিত ৷ আমার পুলিশের গাড়ির ড্রাইভারই পরীক্ষা নিল ৷ রাস্তায় ট্রায়েল রানের পাশাপাশি মাঠে ফুলের টব প্লেস করে আঁকা-বাঁকা রাস্তা বানানো হল ৷ এবার একবার সামনে গিয়ে গাড়ি পিছিয়ে প্রথমাবস্থায় নিয়ে আসতে হবে ৷ মহাদেব সরকার সসম্মানে পরীক্ষা পাশ করল ৷ পারিশ্রমিক চাইল মাসে চার হাজার টাকা ৷ বিনা বাক্যব্যয়ে রাজি হলাম ৷ সপ্তাহ-খানেক খুব ভালো চলল ৷ তারপর গাড়ির মাইলেজ কমতে থাকল ৷ এমনিতে অল্টো-গাড়ি প্রতি লিটার তেলে ষোল-সতের কিলোমিটার পথ অনায়াসে যায় ৷ মাস দু`য়েকের মধ্যে মাইলেজ দশ-এগারোতে নেমে এল ৷ ভাবলাম শহরের যানজটের দঙ্গলে গাড়ি চালাতে গিয়ে এই বিপত্তি ৷ আবার নতুন উপসর্গ ৷ ব্যাটারি ডিসচার্জ হয়ে গেল ৷ গাড়ি সেল্ফ-স্টার্ট হয় না ৷ বিশেষজ্ঞরা মত দিলেন ব্যাটারি পাল্টাতে হবে ৷ নতুন ব্যাটারি লাগল ৷ সাথে তদন্ত কমিশন বসল ৷ চেয়ারম্যান পুলিশের ড্রাইভার ৷ আমার দেহরক্ষী সদস্য ৷ অল্টো-গাড়ির পেট্রল ট্যাঙ্ক থেকে নল লাগিয়ে সাইফন করে বার করা সহজ নয় ৷ এ.সি. পাম্পের আউট-লেটের নলের মুখ খুলে, বার বার অফ-অন করে তেল চুরি করতে হয় ৷ সাথে ড্রাইভারের পাশের সিটটি লম্বা করে, এসি চালিয়ে মহাদেব সুখনিদ্রা দিত ৷ ফলে ব্যাটারির এই দশা ৷ আমি তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করলাম না ৷ বনেটের মাথায় এবং তেলের ট্যাঙ্কের ঢাকনিতে কাগজের উপর হস্তাক্ষর দিয়ে সেলোট্যপ দিয়ে এঁটে দিলাম ৷ বললাম এই সিল আমার অনুমতি ছাড়া খোল যাবে না ৷ তৃতীয় দিন থেকে মহাদেব অন্তর্হিত হল ৷ বলল সন্দেহের পরিবেশে সে চাকুরী করতে চায় না ৷ একদিন এসে সে তার পাওনা নিয়ে গেল ৷

এবার আরেকটি ছেলেকে রাখলাম ৷ প্রদীপ চক্রবর্তী ৷ আমাদের এক কনস্টেবলের ছেলে ৷ ছেলেটি বিবাহিত ৷ ঘরের লোকেরা একজন গুরুদেবের দীক্ষিত ৷ বাড়িতে মাছ-মাংস চলে না ৷ কিন্তু সে বন্ধু-বান্ধবের সান্নিধ্য ভুলতে পারে না ৷ সুযোগ পেলেই তাদের সাথে আমিষ খাবার খায় ৷ চালক সে ভাল, কিন্তু সময়ের প্রতি হিসাব থাকে না ৷ মিথ্যা বাহানায় দেরি করে ৷ আমাকে প্রক্সি দিতে ৷ সব সময় একটা উৎকণ্ঠায় থাকতে হয় ৷ আরেকটি বিষয় নজরে এল ৷ ছেলেটি ভীষণ ভাবে ঘামে ৷ ওর অবর্তমানে স্টিয়ারিং ধরলে হাতে চট-চট করে ৷ আমার লোকেরা বলল, ছেলেটি হয়তো নেশার ট্যাবলেট খায় ৷

আমাদেরকে এই অসহায় অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দিল তাজ ইসলাম ৷ অটো ড্রাইভার-কাম-মালিক ৷ প্রতি ট্রিপ-পিছু একশো টাকা ৷ মাসে কমপক্ষে পঁয়ত্রিশটি ট্রিপের খরচ দিতে হবে ৷ আমরা আবিষ্কার করলাম ড্রাইভার রাখার খরচেই দিব্যি টিচারের বাড়িতে ছেলের যাওয়া-আসা হয়ে যাচ্ছে ৷ তাজ খুবই দায়িত্বশীল ৷ যেদিন ফিরতি ট্রিপে নিজে থাকতে পারে না, অন্য অটো ড্রাইভারের কাছে ভাড়া দিয়ে দেয় ৷ আমার ছেলেকে ঘরে নামিয়ে দেওয়ার জন্য ৷

এরমধ্যে আমি ট্রাফিক পুলিশের এস.পি. হিসাবে যোগ দিলাম ৷ দু`এক দিন সে আমার হাতে ধরা পড়ল, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহনের জন্য ৷ এক দু`বার মাপ করলাম ৷ দু`একবার ফাইন দিল ৷ একদিন জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন এমন কর?’
মাথা চুলকে বলল, ‘স্যার, সিস্টেমের মধ্যে থাকতে হয় ৷ ফাইন দিলেও, অটো চালু থাকলে লাভ থাকে ৷

একদিন এক মজার দৃশ্য দেখলাম ৷ উপজাতি এক নেতা তাজকে সেলাম ঠুকছে ৷ তারপর বেশ অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে তাজের সাথে কথা বলল ৷ যুব নেতা ৷ খুবই উচ্চশিক্ষিত ৷ কয়েকবার বিদেশেও গিয়েছে ৷ তবে বৈরীদের সাথে সংযোগের সন্দেহে পুলিশ একবার তাকে গ্রেপ্তারও করেছিল ৷ কয়েকদিন পর আমি তাজের কাছে জনজাতি নেতার সাথে তার কি করে সখ্যতা হল জানতে চাইলাম ৷ একগাল হেসে সে অনেক কথা বলল ৷ সংক্ষেপে গল্পটি তুলে ধরছি ৷


বেশ কয়েক বছর আগের কথা ৷ তাজ ইসলাম তখন মারুতি ভ্যান চালাত ৷ যুব-নেতার দল তখন উপজাতি স্বশাসিত জেলা-পরিষদের মসনদে ৷ তাজের গাড়ি তখন সেখানে ভাড়া খাটত ৷ উপজাতি বৈরীদের তখন রাজ্যে রমরমা ৷ প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ঘটনা করছে ৷ খুন, অপহরণ, লুটপাট, জুলুমবাজি ইত্যাদি ৷ হিন্দু বাঙ্গালিরাই বিশেষ করে টার্গেট ৷ বিশেষ করে প্রথম দিকে ৷ মুসলিমদের রেহাই দিত ৷ কারণ সম্ভবত: মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশের মাটিতে তাদের ক্যাম্প ছিল ৷ এখানে মুসলিমরা অত্যাচারিত হলে উগ্রবাদীরা বাংলাদেশে থাকতে পারবে না ৷ মোদ্দা-কথা তাজের গাড়ি নিয়ে উপজাতি নেতারা যত্রতত্র যেত ৷ আর ধান্ধা করত কিভাবে টু`পাইস সরকারী টাকা আত্মসাৎ করা যায় ৷ এমনি অনেক কিছু নজরে আসত তাজের ৷ তার কথায়, একবার নেতাটি জালিয়াতিতে পড়েছিল ৷ একটি চেকে দশ-হাজারের পেছনে শূন্য লাগিয়ে একলাখ টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নিয়েছিল ৷ ব্যাংক ম্যানাজারও ছিলেন জনজাতি সম্প্রদায়ের ৷ ওই দলকেই সমর্থন করতেন ৷ যখন তিনি বিষয়টি ধরতে পারলেন, দলের সভাপতির কাছে বিচার চাইলেন ৷ বেশ কয়েক মাস লাগিয়ে সভাপতি সেই টাকা আদায় করে দেন ৷ অবশ্য কোন মামলা-মোকদ্দমা হয় নি ৷ তাজ আরো অনেক কিছু বলেছিল ৷ বৈরী, রাজনীতি এবং অর্থের ত্রিবেণী সঙ্গমের ৷ আর আমি উপলব্ধি করেছিলাম হুমায়ূন আহমেদের একটি উক্তির সত্যতার : ‘মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষগুলোই পৃথিবীর আসল রূপ দেখতে পায় ৷’

Monday, 3 October 2016

THE VOICE OF MY PROTEST.....


Takarjola is a tribal hamlet of present Sepahijola district. ‘Taka’ means ‘currency note’ and ‘jola’ means ‘pond’, together it’s a pond full of currency notes. There is a huge water body at Takarjola but it only produces fish. The epistemology of Takarjola centres round this pond and it lies in a Kokborok word ‘Takha’, meaning ‘crow’. Hundreds of crows take rest in tree branches around this pond. Local indigenous people used to call this pond ‘Takhajola’. Eventually ‘Takhajola’ has taken the present form Takarjola. Baishak Debbarma hails from Takarjola. He is my colleague as Superintendent of Police and is on the verge of retirement from service. He joined in service as Sub-Inspector more than three decades ago clearing the Tripura Public Service Commission examination. His father Bhudev Debbarma didn’t like his son choosing the police profession. Bhudev Debbarma is no more. He was a member of Gana Mukti Parishad, a sister organization of Communist Party. Immediately after the merger of Tripura with Indian union, the Communist Party was a banned organization in the State. Many members of Gana Mukti Parishad like Bhudev Debbarma were in the fugitive list of police. So police was on hunt for him and at times   carried out abortive raids in his house at nights. Baishak Debbarma was a mere child then. The cops used to express their anger by disturbing the household articles in the name of search. Occasionally, even they left marks of soiled shoes on their beds. Especially in winter nights the house inmates had to spend sleepless nights after such torments. Bhudev Debbarma was fond of a Bengali song of Salil Choudhury:

Amar Protibader Bhasha,
 Amar Protirodher Aagun,
Digun Jale Jeno,
 Digun Pratishudhe.’’..

....The voice of my protest and fire of my resistance should ignite with double intensity in double revenge...

Baishak Debbarma has witnessed many happenings since his joining in police service. Apart from political changes, he has seen the rise and fall of extremism in the State. His profession has kept him busy all the times giving him no chance to look back towards yesteryears.  Yet, at times his childhood memories use to peep in his mind, especially when the State was facing extreme insurgency.  


It’s a story which dates back to about a decade and half. Baishak Debbarma was then posted in TSR and performing the duty of in-charge of an interior camp in Jirania area. Insurgency has few phases. It starts with terrorism which may not have any ideology. Then it turns into extremism which projects some demand to unleash terror and at times, the extremists hold self-styled ranks similar to the military to earn the status of militants. Finally, when they get the support of common people, it turns into insurgency. In those days we were witnessing the metamorphosis from militancy to insurgency in our State. In such tribal hamlets villagers, especially ladies were forced by the militants to put up steep challenge before the cops in their endeavour for apprehending militants. Occasionally, they even ventured to snatch away the arrested accused persons.  

One fugitive hardcore extremist had his residence within the jurisdiction of the camp Baishak Debbarma was commanding. He was wanted in many extremist related cases. Mr. Debbarma got information that the fugitive was visiting his house in the evening for dinner for last few days almost regularly. One day the officer accompanied by his staff waylaid in the bush behind the hut of wanted person from the afternoon. In the interior villages in Tripura, indigenous people take early dinner. When the fugitive came for dinner just after twilight, he was apprehended. The extremist’s house was in a solitary corner of the village. Within no time of his arrest, his wife raised alarm and rushed to the nearby huts for help. Baishak Debbarma played a trick. He sent the arrested person to the camp with a small escort and he remained at the spot with other staff to give an impression that further search was in progress as per interrogation of the arrested person. Soon the village womenfolk gathered there led by the wife of the arrested person armed with sticks and kerosene lamps. They were blowing conks and bells to attract more crowds. The crowd had a sigh of relief finding the security forces led by Baishak Debbarma still there. This time, Mr. Debbarma and his staff marched towards his camp. The entire gathering followed them shouting slogans in demand of release of the arrested person. Reaching his camp, Mr. Debbarma alerted his people and asked them to be on their toes to thwart any attempt by the mob to overrun the camp. He then marked a line on the ground and warned the mob not to dare crossing the Laxman Rekha, else they would face bullets. The crowd didn’t venture to enter into the camps; instead they made noise and sprayed volley of abusive words towards the force. At times, wild foxes joined them in the chorus. The TSR boys under the command of Baishak Debbarma remained resolute. Finally, around ten in the night, the crowd gradually disappeared. By the midnight the arrested extremist was shifted to the police station. The morning came as usual but the area surrounding the camp became dirty and full of night soils.

After about two years from this incident, Baishak Debbarma was still continuing in TSR. He was then posted in an interior camp under Champahour Police Station. It’s again a tribal hamlet. One afternoon he went out for patrolling with his troops. It was a routine patrol. Suddenly, noticing the security forces, a tribal youth tried to flee away. The cops chased him and managed to detain him. He was in his twenties. Mr. Debbarma decided to interrogate him on the spot to find out why he was escaping. But, within no time they were encircled by a group of agitated tribal ladies led by the mother of the detained youth. Out of the blue, the leader stripped her dress to announce her protest. At once, Baishak Debbarma released the boy. The womenfolk disappeared with the boy within no time. 

Mr. Debbarma made some enquiry and identified the house of the boy. The youth was suffering from mental illness. After sometime, Baishak Debbarma paid a visit to the house of the boy. Her mother was present and she was quite normal by that time. Baishak Debbarma said to her, “You are like my mother. Tell me why you had behaved like this a little while ago. We haven’t tortured your son. We were enquiring why he had escaped on seeing us.”

The lady remained mum. Her silence led him to add few more words, “That your son is suffering from mental illness you could have told us. Khowai is the native place of Dasharath Debbarma. I had high regards for Khowai and its people from my childhood days for their knowledge and wisdom. Today my belief is completely shattered.”

The lady had no answer to these queries. She burst into tears embracing Baishak Debbarma. From that day onwards, Baishak Debbarma and his TSR troops didn’t face a single resistance in the area in their lawful endeavours.  


Sunday, 25 September 2016

আসলং



বনফুল মেঘনাদবাবুর প্রিয় সাহিত্যিক ৷ আমের সিজন এলে একটি গল্প তাঁর  মনে আসে৷ অনুগল্প ‘বহুরূপী ৷ তাই হুবহু তুলে দিচ্ছি ৷

পাকা আমটির বুকে তীক্ষ্ণ ছোরার মতো দাঁড়কাকের ঠোঁটটা প্রবেশ করল তখন আম যন্ত্রণায় শিউরে উঠল ৷ কিন্তু কিছু বলল না, কারণ তার ভাষা নেই ৷
পরমুহূর্তেই দুম্ করে শব্দ হল একটা ৷
গুলি খেয়ে পড়ে গল দাঁড়কাকটা ৷
আম ভাবল- যাক্ ভগবান আছে তাহলে ৷
ন্যায়বিচার এখনও হয় পৃথিবীতে ৷
পরদিন কিন্তু ন্যায়বিচার এবং ভগবান আর একরূপে দেখা দিলেন ৷
একটি লোক গাছে উঠে আমটিকে মুচড়ে ছিঁড়ে নিল বোঁটা থেকে ৷ পুরল একটি থলির ভিতর ৷ সেখানেও অনেক ছিন্নবৃন্ত আম রয়েছে ৷ একটু পরে তাদের নিয়ে গিয়ে স্তূপীকৃত করা হল পাকা মেঝের উপর ৷
কে একজন বললে- যে আমগুলোকে কাকে ঠুকরেছে সেগুলোকে আলাদা কর ৷ ওগুলো রস নিংড়ে রাখ এই পাথরের বাটিতে ৷ ওগুলো দিয়ে আমসত্ত্ব হবে-৷ পরদিন আমের রস প্রখর রোদে পুড়তে লাগল ৷
আমের আইন, কাকের আইন আর মানুষের আইন এক নয় ৷
আইন বহুরূপী ৷

মেঘনাদবাবুর আম সম্পর্কিত বিচারে একটু পরিবর্তন এসেছে ৷ এখন তাঁর মনে অন্য একটি গল্প আসে ৷ এবছরের মে মাসের ঘটনা ৷ মেঘনাদবাবু সরকারী কাজে গিয়েছিলেন আমবাসা ৷ বিভিন্ন দপ্তরের আমলারাও ছিলেন ৷ পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তাও ছিলেন ৷ বিভিন্ন দপ্তরকে নিয়ে মিটিং ৷ দুপুরে খাবারের আয়োজন ছিল ৷ আমবাসায় এলে আম খেতে হয় ৷ শেষে পাতে আমের চাটনি ৷ সেই খেতে খেতেই বরুণ দেববর্মার সাথে গল্প ৷ বরুণবাবু পুলিশের অফিসার ৷ গল্পচ্ছলে কথা ৷ বরুণবাবু বললেন, ‘এই আম খাওয়া নিয়ে গেল বছর দুটো বাচ্চা খুন হল ৷
-   সে কি?
-   পত্রিকায় হয়তো দেখে থাকবেন ৷ সুদূর রইস্যাবাড়ি থানাধীন রতননগর এলাকায় ৷ রাইমা নদীর পারে ৷
-   হ্যাঁ, এক্ষণে আবছা মনে পড়ছে ৷ বৃষ্টির মরশুম ছিল ৷ বাচ্চাগুলি আট-দশ বছরের৷ বলুনতো কি হয়েছিল ঘটনা ৷
-   ঠিক স্যার, বর্ষার মরশুম ৷ সম্ভবত: জুলাই মাস ৷ ছদ্মনামে বলছি ৷ ক ও খ সমবয়সী ৷ দুজনেরই বয়স এগারো ৷ ক-র ছোট ভাই গ ৷ বয়স সাত ৷ খ-র ভাই ঘ৷ বয়স আট ৷ সবাই আসলং পরিবারের ৷ ত্রিপুরার জনজাতিদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া ৷ তাদের ছ`মাস কাটে পাহাড়ের জুম হাটে ৷ ছ`মাস ইদানীং অপেক্ষাকৃত সমতলে ৷ কারণ রেগার কাজ পাওয়া যায় ৷ এই সুবাদেই বাচ্চাগুলি ভর্তি হয়েছিল স্থানীয় স্কুলে ৷ মিড ডে মিলের সাথে সেদিন একটি করে পাকা আম ছিল ৷ স্কুলের আঙ্গিনায় একটি আমগাছ ৷ ক ও খ বাজি ধরল ৷ দু`জনের মধ্যে দৌড়ে আম গাছটি যে আগে ছুঁতে পারবে সে বন্ধুর আমটি পাবে ৷ অতিরিক্ত হিসাবে ৷ বাজিতে খ জয়ী হল৷ ক তার কথা রাখল না ৷ বন্ধুকে নিজের আমটি দিল না ৷ খ তার রাগ মনে মনে পুষে রাখল ৷ মধ্যে কয়েক দিনের জন্য স্কুল বন্ধ ছিল ৷ আবার যখন স্কুল খুলল বন্ধুর সাথে স্বাভাবিক ভাবেই মিশল ৷

মাস খানেক পরের ঘটনা ৷ খ ক-কে প্রস্তাব দিল সে ময়না পাখি পুষতে চায় কি না ৷ সে রাইমা নদীর পারের জঙ্গলে ময়নার বাসা দেখে এসেছে ৷ দুটো বাচ্চা ডানা মেলার অপেক্ষায় ৷ খ-এর কথায় ক একপায়ে রাজি ৷ তাদের দু`জনের সঙ্গ নিল গ ও ঘ ৷ খ একটি টাক্কল দা নিল ৷ ঝোপ-ঝাড় কাটতে হয় ৷ তখন সকাল ৷ রাইমা নদীর পার ধরে খ-র দেখানো পথে চারজন অনেকটা পথ এগিয়ে গেল ৷ আশপাশে ঘরবাড়ি নেই ৷ ছোট ছোট ঝোপ-ঝাড় ৷ এবার একটি জায়গায় খ থামল ৷ একটি ডুম্বুর গাছের কাছে গিয়ে নিচু হয়ে কিছু দেখার চেষ্টা করল ৷ এবার ক-কে ইশারায় ডাকল ৷ আঙ্গুল দিয়ে একটি ঝোপের দিকে দেখাল ৷ ময়নার বাসা দেখতে বলল ৷ ক ঝুঁকে পড়ে বন্ধুর দেখানো দিশাতে তাকাল ৷ মুহূর্তে খ টাক্কল দিয়ে ক-র মাথায় কোপাতে শুরু করল ৷ তার মুখ থেকে পশুর মত কিছু অবোধ্য আওয়াজ বেরিয়ে আসছিল ৷ ক-র সেখানেই মৃত্যু হল ৷ ঘটনার আকস্মিকতায় গ ও ঘ বাকরুদ্ধ ৷ এবার খ-তার জিঘাংসার কারণ ব্যক্ত করে ৷ গ ও ঘ-কে শাসায় ৷ মুখ খুললে তাদেরও পরিণতি হবে ক-এর মত ৷

তারা গ্রামের দিকে রওয়ানা হল ৷ কিছুদূর আসার পর গ-র কান্না পেল ৷ সে বলল, ভাইয়ের মৃত্যুর কথা বাড়িতে বলে দেবে ৷ খ-র হিংস্রতা আবার প্রকাশ পেল ৷ গ-কেও খুন করল ৷ রাইমা নদীর জলে টাক্কলটি পরিষ্কার করল ৷ ইতিমধ্যে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামল ৷ দুপুরের কিছু পর খ ও ঘ ঘরে ফিরে এল ৷ বিকেল থেকে নিরুদ্দেশ  ক ও গ-র খবর শুরু হল ৷ খ ও ঘ-কেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হল ৷ অনেকে সকালে চারটি বাচ্চাকে একসাথে যেতে দেখেছে ৷ খ-বলল, তারা রাইমা নদীর অপর পারে গিয়েছিল ৷ ফেরার পথে বৃষ্টি নামে ৷ তাড়াহুড়ো করে ফিরে আসে ৷ লক্ষ্য করে নি বন্ধুরা ফিরল কি না ৷ ঘ-ও দাদাকে সমর্থন করল ৷ পাহাড়ি নদী ৷ খুব দ্রুত জলস্ফীতি হয় ৷ ক ও গ সাতার জানত ৷ তল্লাশি চলল ৷ বাচ্চা দু`টির হদিস মিলল না ৷ সবাই ভাবল বানের তোড়ে বাচ্চা দু`টি ভেসে গেছে ৷ কিন্তু মৃতদেহ মিলল না ৷ পুলিশও কিছুটা তৎপর হল ৷

পরদিন থেকে বাচ্চাদের স্কুলে পরীক্ষা ৷ খ ও ঘ পরীক্ষা দিল ৷ এর মধ্যেই মাঝে মাঝে ডেকে এনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হল ৷ এবার আলাদা আলাদা ৷ তৃতীয় দিন সন্ধ্যার পর ঘ প্রথম মুখ খুলল ৷ তারপর খ-ও স্বীকার গেল ৷ মৃতদেহ দু`টি উদ্ধার হল ৷ সাথে খুনের হাতিয়ার ৷ স্যার, খ-র এই জিঘাংসার কারণ কি?

বাকরুদ্ধ মেঘনাদবাবু অন্য কথা ভাবছিলেন ৷ ভারতীয় দণ্ডবিধি আইন সম্পর্কে তিনি অবগত ৷ বড়দের আইন এবং ছোটদের আইন আলাদা ৷ আইনের ধারা অনুযায়ী খ কিংবা ঘ-র কোন সাজা হবে না ৷ তিনি ভাবলেন, ‘আইন সত্যি বহুরূপী!’

মেঘনাদবাবুর কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে বরুণবাবু আবার সরব হন, “স্যার, আমি এই ঘটনার একটি ব্যাখ্যা মনে মনে ভেবে রেখেছি ৷ ছেলেগুলি আসলং জন-জাতিভুক্ত ৷ তারা জুমচাষে অভ্যস্ত ৷ সভ্যতা থেকে দূরে থাকে ৷ ন্যায়-অন্যায় ধর্ম এইসব বিষয়ে অবগত নয় ৷ এদের বাচ্চারা নীতিকথা শেখেনি ৷ তাই হয়তো এই পাশবিক আচরণ ৷
-   হয়তো তুমি ঠিকই বলছ ৷ কিন্তু আসলংরা তৎসম নাম রাখে ৷ রামায়ণ-মহাভারতের চরিত্রের সাথে পরিচিত ৷ মহাকাব্য দু`টি থেকে তাদের প্রচুর নাম পাবে ৷
-   স্যার, আরেকটি কথা ককবরকে আসলং কথর অর্থ ‘ইচড়ে পাকা ৷ আমার ধারণা আসলংরা জঙ্গলের পরিবেশ এবং সভ্যতার পরিবেশের বিচারে ইচড়ে পাকা অবস্থানে বিরাজ করছে ৷
-   তোমার মতবাদকে আমি মান্যতা দিতে পারছি না ৷ খোঁজ নিলে দেখবে সভ্য সমাজেও অনুরূপ ঘটনার নজির রয়েছে ৷ হয়তো এখনো আসলংদের চাহিদা রুটি-কাপড়া-মোকান ৷ খ হয়তো এই জিঘাংসা  সিনেমা-টিভি থেকেই শিখেছে ৷ টিভি-মোবাইলের দৌড়ত এখন সর্বত্র ৷ আমাদের সংস্কৃতির রূপরেখা সম্পর্কে আমরা ইচড়ে পাকা ৷ এখানেই মানবজাতির অবস্থান আসলং ৷